পৃথু স্যন্যাল

ক্যাটাগরি আত্মজীবনী

  • বসন্তপুর: যেখানে গেড়ে আছে শেকড়

    বসন্তপুর: যেখানে গেড়ে আছে শেকড়

    হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, কোনো বাঙালি আজ পর্যন্ত আত্মজীবনী লেখেনি, কেননা আত্মজীবনী লেখার জন্যে দরকার সততা; বাঙালির আত্মজীবনী আসলে শয়তানের লেখা ফেরেশতার আত্মজীবনী। আমি উল্টো পথে হাঁটতে চাই। সততার সঙ্গে লিখে যেতে চাই নিজের কথা — তাতে যদি ফেরেশতার মুখোশ খসে পড়ে, যদি আমি হয়ে উঠি শয়তান, কিংবা শয়তানেরও অধম, পিশাচ — তবে তাই হোক। এ লেখা সেই পিশাচেরই জবানবন্দি।

    বিদ্যুৎহীন এক গ্রাম

    আমার জন্ম উনিশশো পঁচাশির পহেলা ডিসেম্বর, আর শৈশবের প্রথম দশটি বছর কেটেছে এমন এক অজপাড়াগাঁয়ে, যেখানে সন্ধ্যা নামত কুপির আলো আর জোনাকির যৌথ আয়োজনে। যতদূর জানি, আজও সেখানে বিদ্যুতের তার পৌঁছায়নি; বড়জোর দু-চারটি ঘরের চালে সৌরপ্যানেল রোদ পোহায়। মানচিত্রের এক কোণে অবহেলায় পড়ে থাকা, বিচ্ছিন্ন এক জনপদ।

    ‘যতদূর জানি’ বলছি, কারণ নিশ্চিত করে জানার উপায় নেই — গ্রামের কারও সঙ্গে আজ আর আমার কোনো যোগাযোগ নেই। যে নাড়ি একদিন ওই মাটির সঙ্গে বাঁধা ছিল, সেটি কবে, কেন ছিঁড়ে গেল — সে গল্প তোলা থাক আরেক দিনের জন্য।

    গ্রামের নাম বসন্তপুর; মানুষের মুখে মুখে ঘষা খেয়ে, নদীর স্রোতে পাথর যেমন গোল হয়ে আসে, তেমনি সে নাম ক্ষয়ে হয়ে গেছে বসনপুর। সপ্তাহে দুদিন, শুক্র আর সোমবার, হাট বসত বসনপুর বাজারে। আশপাশের কয়েক গ্রাম থেকে মানুষ আসত। হাটবারে সারা বাজার যেন ঘুম ভেঙে গা ঝাড়া দিয়ে উঠত; বাকি পাঁচটা দিন ঝিমিয়ে থাকত পরের হাটের অপেক্ষায়।

    বাজারের উত্তর মাথা থেকে একটা সড়ক বেরিয়ে গেছে। বাজারের শেষ প্রান্ত থেকে সেই সড়ক ধরে মিটার তিনশো হাঁটলেই বসন্তপুর প্রাইমারি স্কুল। স্কুল পেরোলে হেডমাস্টার সুজাত আলীর বাড়ি — তিনি আমার খালু, মায়ের সৎবোনের স্বামী। তারপর করিমদের বাড়ি, আর তার পরেই আমাদের। সড়কটা ছিল আমার শৈশবের মেরুদণ্ড — এক মাথায় বাজারের কোলাহল, মাঝখানে স্কুল আর আত্মীয়তা, অন্য মাথায় ঘর। জীবনের প্রথম মানচিত্রটা আঁকা হয়ে গিয়েছিল ওই একটুকরো পথের ওপরেই।

    ঠিক কোন সালে আমাদের টিনের ঘর উঠেছিল, হুবহু মনে নেই। মনে আছে তার আগের ঘরটির কথা — মাথায় খড়ের ছাউনি, চারপাশে ইকরের বেড়া। ইকর অনেকটা নলখাগড়ার মতো লম্বা এক রকম ঘাস। টিন এসে একদিন সেই খড়কে সরিয়ে দিল, যেমন করে সময় এসে সরিয়ে দেয় সবকিছু — খুব একটা জানান না দিয়েই।

    আমরা দুই ভাই, দুই বোন। বাবা মতিন মাস্টার। মায়ের একটা ভালো নাম ছিল — রাহেলা খাতুন — কিন্তু সে নামে তাঁকে প্রায় কেউ ডাকত না; সবার কাছে তিনি ছিলেন মাসুমের মা। গ্রামের মেয়েদের নাম এভাবেই হারিয়ে যায় — সন্তানের নামের আড়ালে, যেন মা হওয়াটাই তাঁদের একমাত্র পরিচয়পত্র। এই ছিল আমাদের সংসার।

    গুলা

    শৈশবের যত স্মৃতি মনের তলানিতে এখনো থিতিয়ে আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে পুরোনোটা সম্ভবত আটাশির বন্যা। বয়স তখন আড়াই বছরের কিছু বেশি। স্মৃতিটা স্পষ্ট নয়, ঘষা কাচের ওপাশের ছবির মতো ঝাপসা। ভাসা ভাসা মনে পড়ে — বাড়ির পাশের বাঁধ উপচে পানি উঠে এসেছে উঠানে, ছুঁয়ে ফেলেছে ঘরের চৌকাঠ, যেন ভেতরে ঢোকার অনুমতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অনাহূত অতিথি। উঠানে সাপেরা খেলা করছে, আর সারা ঘর ছেয়ে গেছে পিঁপড়েয় — ডাঙা হারানো সব প্রাণী আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিল মানুষের ঘরে।

    অথচ বন্যা আমাদের কাছে অচেনা কিছু ছিল না। প্রতিবছরই আসত; আমরা বলতাম ‘গুলা’। একদিনের জন্য গ্রামের মাঠ তলিয়ে যেত — সকালে পানি আসত, বিকেলে কিংবা বড়জোর পরদিন ফিরে যেত। লোকে বলত, ‘গুলা আইছে।’ গুলা তিনদিনের বেশি কখনো থাকত না। বছরে একবারের অতিথি — একটু হইচই, একটু কাদা, তারপর বিদায়।

    বরং গুলার দিনটা ছিল উৎসবের মতো। সেদিন গ্রামের লোকেরা নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত পাহাড়ি ঢলে ভেসে আসা বড় বড় গাছ ধরতে। লাকড়ি তো মিলতই, মিলত আসবাব বানানোর মতো গাছও। আমাদের গ্রামের বাড়ির অনেক আসবাব তৈরি হয়েছিল গুলার পানিতে ভেসে আসা সেইসব গাছ থেকে। পাহাড় যা হারাত, আমাদের ঘরে তা-ই হয়ে উঠত বসার, শোয়ার, রাখার আশ্রয়। এক জায়গার সর্বনাশ আরেক জায়গার সংসার — এই পাঠটা তখন বুঝিনি, কিন্তু শিখে ফেলেছিলাম।

    তাই বন্যা যে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, মানুষের সর্বনাশ করতে পারে — এ ধারণাই আমার ছিল না, যতদিন না উনিশশো আটানব্বইয়ে গ্রাম ছাড়লাম। বয়স তখন বারো, তেরো ছুঁই ছুঁই; গ্রাম ছেড়ে একেবারে শহরে চলে আসার প্রথম বছর। সেই বছরই প্রথম মুখোমুখি হলাম এমন এক বন্যার, যে ফিরে যাওয়ার নাম নেয় না। দিনের পর দিন মানুষ পানিবন্দি। যে পানি আমার শৈশবে ছিল উৎসব আর উপহার, শহরে এসে সে-ই দেখা দিল কারাগার হয়ে। একই পানি, ভিন্ন চেহারা — শহর আমাকে প্রথম যে পাঠ দিয়েছিল, সেটা বোধহয় এটাই।

    অচেনা কাঁধ

    এরপর যে স্মৃতিটা মনে পড়ে, তা এক ছোট্ট ছেলের — বাড়ির পাশের সড়কে যে একা দাঁড়িয়ে থাকে। কাউকে বাজারের দিকে যেতে দেখলেই সে পথ আগলে দাঁড়াত, বলত, ‘আমাকে কাঁধে নেন, আমাকে বাজারে নিয়ে যান।’ বাজারে ছিল বাবার হোমিওপ্যাথির দোকান। অচেনা মানুষেরা আমাকে কাঁধে তুলে নিত, তারপর নামিয়ে দিয়ে যেত বাবার দোকানের সামনে।

    আজ ভাবলে অবাক লাগে — কী নিঃশঙ্ক বিশ্বাসে একটা শিশু অচেনা মানুষের কাঁধে নিজেকে তুলে দিত, আর কী অনায়াসে সেই অচেনারা তাকে পৌঁছে দিত ঠিক জায়গায়। সে গ্রামে আসলে অচেনা বলে কেউ ছিল না; ছিল কেবল নাম-না-জানা চেনা মানুষ। অচেনা কাঁধই ছিল আমার জীবনের প্রথম বাহন, আর সেই উঁচু থেকে দেখা দুলতে থাকা পৃথিবী — ভিড়ের মাথার ওপর দিয়ে, সবকিছু থেকে একটু দূরে — হয়তো সেখানেই আমার দর্শক হয়ে ওঠার প্রথম পাঠ।

    বইয়ের আলমিরা

    বাবা প্রাইমারি স্কুলে পড়াতেন, আর সকাল-বিকেল বসতেন বাজারের সেই দোকানে, হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা করতেন। আমরা ভাইবোনেরা বড় হয়েছি তাঁর চিকিৎসাতেই। একেবারে মরো মরো অবস্থা হয়েছে, তবু কোনো অ্যালোপ্যাথি ওষুধ আমাদের মুখে ওঠেনি। আমাদের কোনো ভাইবোনের কোনো টিকা নেওয়া হয়নি — কিংবা বলা ভালো, দেওয়া হয়নি। বাবা বিশ্বাস করতেন, টিকা ইহুদি-নাসারাদের এক ধরনের অস্ত্র; এর মাধ্যমে মানুষের শরীরের অ্যান্টিবডি নষ্ট করে দেওয়া হয়, আর নানা রকম ক্যানসার ও ডায়াবেটিসের প্রধান কারণ এই টিকা। শিশির ভেতরের ছোট্ট সাদা দানাগুলোই ছিল আমাদের সুরক্ষার একমাত্র দেয়াল — আর সেই দেয়ালের ইট গাঁথা হয়েছিল বিশ্বাস দিয়ে।

    ‘মরো মরো অবস্থা’ কথাটা আমি বাড়িয়ে বলছি না। আমার বড় ভাই মাসুম, আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়, একবার টাইফয়েডে পড়েছিলেন। ঘটনাটা আমার নিজের চোখে দেখা নয়, মায়ের মুখে শোনা; তাই এই দৃশ্যের যতটুকু লিখছি, তার সবটুকুই মায়ের স্মৃতির ছাঁকনি পেরিয়ে আসা। জ্বর নামে না, শরীরটা যেন ভেতর থেকে পুড়ছে, আর বাবার শিশির সাদা দানাগুলো সেই আগুনে নিঃশব্দে গলে যাচ্ছে। শহরের হাসপাতাল ছিল অনেক দূরে — কিন্তু তার চেয়েও দূরে ছিল বাবার বিশ্বাস থেকে একটা অ্যালোপ্যাথি ট্যাবলেট।

    শেষমেশ ভাইকে দেখানো হলো শক্তিয়ার খলা বাজারের এক নামকরা হোমিও ডাক্তারকে। তাঁর নাম আজ আর মনে নেই — সম্ভবত সুশীল চট্টোপাধ্যায়, কিংবা এমনই কোনো নাম। স্মৃতিতে টিকে আছে শুধু এটুকু: তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন, পৈতে পরতেন। নাম হারিয়ে গেছে, থেকে গেছে কেবল একগাছি সাদা সুতো। তাঁর দেওয়া দুই ফোঁটা ওষুধে ভাই সেরে উঠলেন।

    আজ ভাবলে হিসাবটা কিছুতেই মেলে না। যে মানুষ বিশ্বাস করতেন টিকা ইহুদি-নাসারাদের অস্ত্র, তিনিই বড় ছেলের প্রাণ তুলে দিয়েছিলেন এক পৈতেধারী ব্রাহ্মণের হাতে — আর সেই হাত থেকে ঝরে পড়া দুই ফোঁটাই ফিরিয়ে এনেছিল ছেলেটিকে। বাবার বিশ্বাসের দেয়াল তাহলে ধর্মের ইটে গাঁথা ছিল না, গাঁথা ছিল শাস্ত্রের ইটে। কোন হাত ওষুধ দিচ্ছে, তা নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা ছিল না; মাথাব্যথা ছিল ওষুধটা কোন পদ্ধতির, তা নিয়ে। আর ভাইয়ের সেরে ওঠা হয়তো সেই দেয়ালে আরেকটা ইট হয়েই বসে গিয়েছিল — একটা বেঁচে যাওয়া প্রাণই যেন যথেষ্ট প্রমাণ, মরে যেতে পারত যে প্রাণগুলো, তারা কোনো হিসাবের খাতায় ওঠে না।

    তবে এ থেকে বাবাকে অজ্ঞ ভাবার কারণ নেই। বরং উল্টো — তিনি প্রচুর পড়তেন। বাড়িতে যখন বিশ্রাম নিতেন, দেখতাম বিছানায় কাত হয়ে বই পড়ছেন। আমাদের ঘরে ছিল একটা স্টিলের আলমিরা, আর তার ভেতরে বই আর বই। আলমিরায় যে মানুষ জামাকাপড় রাখে, সে কথা একটা বয়স পর্যন্ত আমাদের জানাই ছিল না। আমরা জানতাম, আলমিরা হলো বইয়ের ঘর; জামাকাপড় থাকে আলনায়। সে আলমিরা ছিল ঠিক বাবার মনের মতো — বাইরে ইস্পাতের শক্ত খোলস, ভেতরে ঠাসা অক্ষর, আর সেই অক্ষরের বেশিরভাগই এক দিকে মুখ ফেরানো।

    বলা যায়, বইয়ের প্রতি আমার টান তৈরি হয়েছিল তাঁকে দেখেই। তাঁর বইয়ের বেশিরভাগ ছিল ইসলামি সাহিত্য, তবু বিজ্ঞানকে তিনি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। বলতেন —

    — ইসলামের সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনো বিরোধ নেই, বরং ইসলাম বিজ্ঞানকে এগিয়ে যেতে বলে। মুসলমানরা আজ বিজ্ঞানবিমুখ হয়ে গেছে বলেই সারা বিশ্বে অবহেলিত। মুসলমানদের আবার বিজ্ঞানের দখল নিতে হবে। তবেই মুসলমানদের মুক্তি সম্ভব।

    এই বিশ্বাস থেকেই তিনি আমাদের কোনো ভাইবোনকে মাদ্রাসায় পাঠাননি। তাঁর মতে মাদ্রাসায় প্রকৃত ইসলাম শেখানো হয় না, বিজ্ঞান তো নয়ই। আর এখন মুসলমানদের শিখতে হবে বিজ্ঞান — তাই আমরা পড়েছি স্কুলে।

    আমাকে ঘিরে তাঁর আশা ছিল আকাশছোঁয়া। শৈশবে আমি খুব মেধাবী ছিলাম — যেকোনো কিছু একবার পড়লেই মাথায় গেঁথে যেত, আলাদা করে মুখস্থ করতে হতো না। বাবা স্বপ্ন দেখতেন, আমি একদিন অনেক বড় বিজ্ঞানী হব — মুসলমান বিজ্ঞানী।

    নামের উত্তরাধিকার

    বাবার স্বপ্ন শুধু আমাদের ভবিষ্যতে লেখা ছিল না, লেখা ছিল আমাদের নামেও। তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্য ছিল জামায়াতে ইসলামীর প্রতি, আর দুই ছেলের নাম তিনি রেখেছিলেন নিজের নেতাদের নামের সঙ্গে মিলিয়ে। বড় ভাই এ কে এম কামারুজ্জামান মাসুম — জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের নামে। আর আমি এ বি এম আশরাফুজ্জামান — একাত্তরের আলবদর নেতা আশরাফুজ্জামান খানের নামে। জন্মের দিনই আমাদের গায়ে পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুটো জামা, যা আমাদের মাপে কাটা নয়, কাটা অন্য দুই মানুষের মাপে।

    আশরাফুজ্জামান খান — একাত্তরের ডিসেম্বরে যাঁর দল ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, আর যাঁদের আর কখনো ফিরতে দেওয়া হয়নি। দুই হাজার তেরো সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

    কিন্তু সেই আনুগত্য দূর থেকে দেওয়া নিছক সমর্থন ছিল না। ফুপুর মুখে শুনেছি — একাত্তরে বাবা ছিলেন ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার মানুষ, পড়তেন কোনো এক মাদ্রাসায়, আর করতেন ইসলামী ছাত্রসংঘ — জামায়াতের সেই ছাত্র সংগঠন, একাত্তরে যার কর্মীদের নিয়েই গড়ে উঠেছিল আলবদর বাহিনী। বাহাত্তরে তাঁর নামে হুলিয়া জারি হয়। শুনেছি, সেসময়ের মুক্তিযোদ্ধারা ঘোষণা দিয়েছিলেন — জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে বারো হাজার টাকা পুরস্কার। একজন মানুষের দাম, জীবিত কিংবা মৃত, বারো হাজার টাকা। প্রাণ বাঁচাতে বাবা ত্রিশাল ছেড়ে পালিয়ে এলেন দেশের আরেক প্রান্তে, সুনামগঞ্জে।

    একাত্তরে তিনি ঠিক কী করেছিলেন, আমি জানি না। কোনো আদালতের রায়ে, কোনো সরকারি তালিকায় এখন পর্যন্ত তাঁর নাম আমি খুঁজে পাইনি। যা আছে, তা কেবল ফুপুর মুখের কয়েকটা বাক্য, একটা হুলিয়া আর বারো হাজার টাকার একটা দাম। তবু এটুকু জানি: যে নাম তিনি আমাকে দিয়েছিলেন, সেটা কোনো দূরের বীরের নাম ছিল না; ছিল তাঁর নিজের সংগঠনের, নিজের সময়ের এক নেতার নাম। যে অতীত তিনি ত্রিশালে ফেলে এসেছিলেন, তার একটা স্মারক তিনি জড়িয়ে দিয়েছিলেন আমার গায়ে।

    সুনামগঞ্জে এসে সেই পলাতক যুবক হয়ে উঠলেন মতিন মাস্টার — প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, হোমিওপ্যাথির চিকিৎসক, বইভর্তি আলমিরার মালিক। বসন্তপুরের যে গ্রামের গল্প দিয়ে এ লেখা শুরু করেছিলাম, তার মাটির নিচে তাহলে চাপা পড়ে আছে আরেকটা জনপদ — ত্রিশাল। আর যে মানুষ নিজে মাদ্রাসায় পড়েছিলেন, তিনিই বলতেন মাদ্রাসায় প্রকৃত ইসলাম শেখানো হয় না, ছেলেদের পাঠিয়েছিলেন স্কুলে। সেটা কি কেবল ধর্মতত্ত্বের বিশ্বাস ছিল, নাকি নিজের অতীত থেকে ছেলেদের দূরে রাখার এক নিঃশব্দ চেষ্টা — এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।

    যে ছেলেকে বাবা বুদ্ধিজীবীদের ঘাতকের নাম দিয়েছিলেন, সেই ছেলেই বড় হয়ে কলম ধরল, কবিতা লিখল, ব্লগে ধর্মকে প্রশ্ন করল — হয়ে উঠল ঠিক সেই জাতের মানুষ, একাত্তরে যাদের নামে তালিকা বানানো হতো। দুই হাজার পনেরোয় যখন নিলয়কে কুপিয়ে মারা হলো আর আমাকে দেশ ছাড়তে হলো, তখন চাপাতিগুলো এসেছিল সেই পুরোনো মতাদর্শেরই নতুন হাত থেকে। বাহাত্তরে বাবা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়েছিলেন, কারণ মুক্তিযোদ্ধারা তাঁকে খুঁজছিল; তেতাল্লিশ বছর পর তাঁর ছেলে প্রাণ বাঁচাতে পালাল, কারণ বাবার মতাদর্শের উত্তরসূরিরা তাকে খুঁজছিল। একই পলায়ন, কেবল উল্টো দিক থেকে। সেই বছরেই ফাঁসি হয় কামারুজ্জামানের — আমার বড় ভাইয়ের নামের মানুষটির। ইতিহাস যেন একই বছরে একই পরিবারের দুটো নামের হিসাব একসঙ্গে মিটিয়ে দিতে চেয়েছিল, দুই উল্টো দিক থেকে।

    একদিন আমি সেই নামটা খোলসের মতো ছেড়ে এসেছি — হয়েছি পৃথু, আর স্যান্যাল। সে গল্প অন্য অধ্যায়ের। এখানে শুধু এটুকু বলে রাখি: আমার জীবনের প্রথম জবানবন্দি আমি নিজে দিইনি; সেটা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল আমার নামে, আমার হয়ে, আমার জন্মের দিনই।

    তাঁর স্বপ্নে দুটি শব্দ ছিল, পাশাপাশি, হাত ধরাধরি করে — ‘মুসলমান’ আর ‘বিজ্ঞানী’। বিজ্ঞানের পথে আমাকে তুলে দিয়েছিলেন তিনি নিজেই। শুধু জানতেন না, সে পথ কোথায় গিয়ে থামে — কিংবা আদৌ থামে কি না। দ্বিতীয় শব্দটিই যে একদিন প্রথমটিকে ভেঙে দেবে, সে কথা বাবার বইভর্তি আলমিরার কোনো পাতায় লেখা ছিল না।

    (চলমান)