পৃথু স্যন্যাল

ক্যাটাগরি লেখালেখি

সকল বাংলা লেখালেখি এই ক্যাটাগরিতে যুক্ত হবে।

  • বসন্তপুর: যেখানে গেড়ে আছে শেকড়

    বসন্তপুর: যেখানে গেড়ে আছে শেকড়

    হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, কোনো বাঙালি আজ পর্যন্ত আত্মজীবনী লেখেনি, কেননা আত্মজীবনী লেখার জন্যে দরকার সততা; বাঙালির আত্মজীবনী আসলে শয়তানের লেখা ফেরেশতার আত্মজীবনী। আমি উল্টো পথে হাঁটতে চাই। সততার সঙ্গে লিখে যেতে চাই নিজের কথা — তাতে যদি ফেরেশতার মুখোশ খসে পড়ে, যদি আমি হয়ে উঠি শয়তান, কিংবা শয়তানেরও অধম, পিশাচ — তবে তাই হোক। এ লেখা সেই পিশাচেরই জবানবন্দি।

    বিদ্যুৎহীন এক গ্রাম

    আমার জন্ম উনিশশো পঁচাশির পহেলা ডিসেম্বর, আর শৈশবের প্রথম দশটি বছর কেটেছে এমন এক অজপাড়াগাঁয়ে, যেখানে সন্ধ্যা নামত কুপির আলো আর জোনাকির যৌথ আয়োজনে। যতদূর জানি, আজও সেখানে বিদ্যুতের তার পৌঁছায়নি; বড়জোর দু-চারটি ঘরের চালে সৌরপ্যানেল রোদ পোহায়। মানচিত্রের এক কোণে অবহেলায় পড়ে থাকা, বিচ্ছিন্ন এক জনপদ।

    ‘যতদূর জানি’ বলছি, কারণ নিশ্চিত করে জানার উপায় নেই — গ্রামের কারও সঙ্গে আজ আর আমার কোনো যোগাযোগ নেই। যে নাড়ি একদিন ওই মাটির সঙ্গে বাঁধা ছিল, সেটি কবে, কেন ছিঁড়ে গেল — সে গল্প তোলা থাক আরেক দিনের জন্য।

    গ্রামের নাম বসন্তপুর; মানুষের মুখে মুখে ঘষা খেয়ে, নদীর স্রোতে পাথর যেমন গোল হয়ে আসে, তেমনি সে নাম ক্ষয়ে হয়ে গেছে বসনপুর। সপ্তাহে দুদিন, শুক্র আর সোমবার, হাট বসত বসনপুর বাজারে। আশপাশের কয়েক গ্রাম থেকে মানুষ আসত। হাটবারে সারা বাজার যেন ঘুম ভেঙে গা ঝাড়া দিয়ে উঠত; বাকি পাঁচটা দিন ঝিমিয়ে থাকত পরের হাটের অপেক্ষায়।

    বাজারের উত্তর মাথা থেকে একটা সড়ক বেরিয়ে গেছে। বাজারের শেষ প্রান্ত থেকে সেই সড়ক ধরে মিটার তিনশো হাঁটলেই বসন্তপুর প্রাইমারি স্কুল। স্কুল পেরোলে হেডমাস্টার সুজাত আলীর বাড়ি — তিনি আমার খালু, মায়ের সৎবোনের স্বামী। তারপর করিমদের বাড়ি, আর তার পরেই আমাদের। সড়কটা ছিল আমার শৈশবের মেরুদণ্ড — এক মাথায় বাজারের কোলাহল, মাঝখানে স্কুল আর আত্মীয়তা, অন্য মাথায় ঘর। জীবনের প্রথম মানচিত্রটা আঁকা হয়ে গিয়েছিল ওই একটুকরো পথের ওপরেই।

    ঠিক কোন সালে আমাদের টিনের ঘর উঠেছিল, হুবহু মনে নেই। মনে আছে তার আগের ঘরটির কথা — মাথায় খড়ের ছাউনি, চারপাশে ইকরের বেড়া। ইকর অনেকটা নলখাগড়ার মতো লম্বা এক রকম ঘাস। টিন এসে একদিন সেই খড়কে সরিয়ে দিল, যেমন করে সময় এসে সরিয়ে দেয় সবকিছু — খুব একটা জানান না দিয়েই।

    আমরা দুই ভাই, দুই বোন। বাবা মতিন মাস্টার। মায়ের একটা ভালো নাম ছিল — রাহেলা খাতুন — কিন্তু সে নামে তাঁকে প্রায় কেউ ডাকত না; সবার কাছে তিনি ছিলেন মাসুমের মা। গ্রামের মেয়েদের নাম এভাবেই হারিয়ে যায় — সন্তানের নামের আড়ালে, যেন মা হওয়াটাই তাঁদের একমাত্র পরিচয়পত্র। এই ছিল আমাদের সংসার।

    গুলা

    শৈশবের যত স্মৃতি মনের তলানিতে এখনো থিতিয়ে আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে পুরোনোটা সম্ভবত আটাশির বন্যা। বয়স তখন আড়াই বছরের কিছু বেশি। স্মৃতিটা স্পষ্ট নয়, ঘষা কাচের ওপাশের ছবির মতো ঝাপসা। ভাসা ভাসা মনে পড়ে — বাড়ির পাশের বাঁধ উপচে পানি উঠে এসেছে উঠানে, ছুঁয়ে ফেলেছে ঘরের চৌকাঠ, যেন ভেতরে ঢোকার অনুমতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অনাহূত অতিথি। উঠানে সাপেরা খেলা করছে, আর সারা ঘর ছেয়ে গেছে পিঁপড়েয় — ডাঙা হারানো সব প্রাণী আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিল মানুষের ঘরে।

    অথচ বন্যা আমাদের কাছে অচেনা কিছু ছিল না। প্রতিবছরই আসত; আমরা বলতাম ‘গুলা’। একদিনের জন্য গ্রামের মাঠ তলিয়ে যেত — সকালে পানি আসত, বিকেলে কিংবা বড়জোর পরদিন ফিরে যেত। লোকে বলত, ‘গুলা আইছে।’ গুলা তিনদিনের বেশি কখনো থাকত না। বছরে একবারের অতিথি — একটু হইচই, একটু কাদা, তারপর বিদায়।

    বরং গুলার দিনটা ছিল উৎসবের মতো। সেদিন গ্রামের লোকেরা নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত পাহাড়ি ঢলে ভেসে আসা বড় বড় গাছ ধরতে। লাকড়ি তো মিলতই, মিলত আসবাব বানানোর মতো গাছও। আমাদের গ্রামের বাড়ির অনেক আসবাব তৈরি হয়েছিল গুলার পানিতে ভেসে আসা সেইসব গাছ থেকে। পাহাড় যা হারাত, আমাদের ঘরে তা-ই হয়ে উঠত বসার, শোয়ার, রাখার আশ্রয়। এক জায়গার সর্বনাশ আরেক জায়গার সংসার — এই পাঠটা তখন বুঝিনি, কিন্তু শিখে ফেলেছিলাম।

    তাই বন্যা যে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, মানুষের সর্বনাশ করতে পারে — এ ধারণাই আমার ছিল না, যতদিন না উনিশশো আটানব্বইয়ে গ্রাম ছাড়লাম। বয়স তখন বারো, তেরো ছুঁই ছুঁই; গ্রাম ছেড়ে একেবারে শহরে চলে আসার প্রথম বছর। সেই বছরই প্রথম মুখোমুখি হলাম এমন এক বন্যার, যে ফিরে যাওয়ার নাম নেয় না। দিনের পর দিন মানুষ পানিবন্দি। যে পানি আমার শৈশবে ছিল উৎসব আর উপহার, শহরে এসে সে-ই দেখা দিল কারাগার হয়ে। একই পানি, ভিন্ন চেহারা — শহর আমাকে প্রথম যে পাঠ দিয়েছিল, সেটা বোধহয় এটাই।

    অচেনা কাঁধ

    এরপর যে স্মৃতিটা মনে পড়ে, তা এক ছোট্ট ছেলের — বাড়ির পাশের সড়কে যে একা দাঁড়িয়ে থাকে। কাউকে বাজারের দিকে যেতে দেখলেই সে পথ আগলে দাঁড়াত, বলত, ‘আমাকে কাঁধে নেন, আমাকে বাজারে নিয়ে যান।’ বাজারে ছিল বাবার হোমিওপ্যাথির দোকান। অচেনা মানুষেরা আমাকে কাঁধে তুলে নিত, তারপর নামিয়ে দিয়ে যেত বাবার দোকানের সামনে।

    আজ ভাবলে অবাক লাগে — কী নিঃশঙ্ক বিশ্বাসে একটা শিশু অচেনা মানুষের কাঁধে নিজেকে তুলে দিত, আর কী অনায়াসে সেই অচেনারা তাকে পৌঁছে দিত ঠিক জায়গায়। সে গ্রামে আসলে অচেনা বলে কেউ ছিল না; ছিল কেবল নাম-না-জানা চেনা মানুষ। অচেনা কাঁধই ছিল আমার জীবনের প্রথম বাহন, আর সেই উঁচু থেকে দেখা দুলতে থাকা পৃথিবী — ভিড়ের মাথার ওপর দিয়ে, সবকিছু থেকে একটু দূরে — হয়তো সেখানেই আমার দর্শক হয়ে ওঠার প্রথম পাঠ।

    বইয়ের আলমিরা

    বাবা প্রাইমারি স্কুলে পড়াতেন, আর সকাল-বিকেল বসতেন বাজারের সেই দোকানে, হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা করতেন। আমরা ভাইবোনেরা বড় হয়েছি তাঁর চিকিৎসাতেই। একেবারে মরো মরো অবস্থা হয়েছে, তবু কোনো অ্যালোপ্যাথি ওষুধ আমাদের মুখে ওঠেনি। আমাদের কোনো ভাইবোনের কোনো টিকা নেওয়া হয়নি — কিংবা বলা ভালো, দেওয়া হয়নি। বাবা বিশ্বাস করতেন, টিকা ইহুদি-নাসারাদের এক ধরনের অস্ত্র; এর মাধ্যমে মানুষের শরীরের অ্যান্টিবডি নষ্ট করে দেওয়া হয়, আর নানা রকম ক্যানসার ও ডায়াবেটিসের প্রধান কারণ এই টিকা। শিশির ভেতরের ছোট্ট সাদা দানাগুলোই ছিল আমাদের সুরক্ষার একমাত্র দেয়াল — আর সেই দেয়ালের ইট গাঁথা হয়েছিল বিশ্বাস দিয়ে।

    ‘মরো মরো অবস্থা’ কথাটা আমি বাড়িয়ে বলছি না। আমার বড় ভাই মাসুম, আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়, একবার টাইফয়েডে পড়েছিলেন। ঘটনাটা আমার নিজের চোখে দেখা নয়, মায়ের মুখে শোনা; তাই এই দৃশ্যের যতটুকু লিখছি, তার সবটুকুই মায়ের স্মৃতির ছাঁকনি পেরিয়ে আসা। জ্বর নামে না, শরীরটা যেন ভেতর থেকে পুড়ছে, আর বাবার শিশির সাদা দানাগুলো সেই আগুনে নিঃশব্দে গলে যাচ্ছে। শহরের হাসপাতাল ছিল অনেক দূরে — কিন্তু তার চেয়েও দূরে ছিল বাবার বিশ্বাস থেকে একটা অ্যালোপ্যাথি ট্যাবলেট।

    শেষমেশ ভাইকে দেখানো হলো শক্তিয়ার খলা বাজারের এক নামকরা হোমিও ডাক্তারকে। তাঁর নাম আজ আর মনে নেই — সম্ভবত সুশীল চট্টোপাধ্যায়, কিংবা এমনই কোনো নাম। স্মৃতিতে টিকে আছে শুধু এটুকু: তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন, পৈতে পরতেন। নাম হারিয়ে গেছে, থেকে গেছে কেবল একগাছি সাদা সুতো। তাঁর দেওয়া দুই ফোঁটা ওষুধে ভাই সেরে উঠলেন।

    আজ ভাবলে হিসাবটা কিছুতেই মেলে না। যে মানুষ বিশ্বাস করতেন টিকা ইহুদি-নাসারাদের অস্ত্র, তিনিই বড় ছেলের প্রাণ তুলে দিয়েছিলেন এক পৈতেধারী ব্রাহ্মণের হাতে — আর সেই হাত থেকে ঝরে পড়া দুই ফোঁটাই ফিরিয়ে এনেছিল ছেলেটিকে। বাবার বিশ্বাসের দেয়াল তাহলে ধর্মের ইটে গাঁথা ছিল না, গাঁথা ছিল শাস্ত্রের ইটে। কোন হাত ওষুধ দিচ্ছে, তা নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা ছিল না; মাথাব্যথা ছিল ওষুধটা কোন পদ্ধতির, তা নিয়ে। আর ভাইয়ের সেরে ওঠা হয়তো সেই দেয়ালে আরেকটা ইট হয়েই বসে গিয়েছিল — একটা বেঁচে যাওয়া প্রাণই যেন যথেষ্ট প্রমাণ, মরে যেতে পারত যে প্রাণগুলো, তারা কোনো হিসাবের খাতায় ওঠে না।

    তবে এ থেকে বাবাকে অজ্ঞ ভাবার কারণ নেই। বরং উল্টো — তিনি প্রচুর পড়তেন। বাড়িতে যখন বিশ্রাম নিতেন, দেখতাম বিছানায় কাত হয়ে বই পড়ছেন। আমাদের ঘরে ছিল একটা স্টিলের আলমিরা, আর তার ভেতরে বই আর বই। আলমিরায় যে মানুষ জামাকাপড় রাখে, সে কথা একটা বয়স পর্যন্ত আমাদের জানাই ছিল না। আমরা জানতাম, আলমিরা হলো বইয়ের ঘর; জামাকাপড় থাকে আলনায়। সে আলমিরা ছিল ঠিক বাবার মনের মতো — বাইরে ইস্পাতের শক্ত খোলস, ভেতরে ঠাসা অক্ষর, আর সেই অক্ষরের বেশিরভাগই এক দিকে মুখ ফেরানো।

    বলা যায়, বইয়ের প্রতি আমার টান তৈরি হয়েছিল তাঁকে দেখেই। তাঁর বইয়ের বেশিরভাগ ছিল ইসলামি সাহিত্য, তবু বিজ্ঞানকে তিনি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। বলতেন —

    — ইসলামের সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনো বিরোধ নেই, বরং ইসলাম বিজ্ঞানকে এগিয়ে যেতে বলে। মুসলমানরা আজ বিজ্ঞানবিমুখ হয়ে গেছে বলেই সারা বিশ্বে অবহেলিত। মুসলমানদের আবার বিজ্ঞানের দখল নিতে হবে। তবেই মুসলমানদের মুক্তি সম্ভব।

    এই বিশ্বাস থেকেই তিনি আমাদের কোনো ভাইবোনকে মাদ্রাসায় পাঠাননি। তাঁর মতে মাদ্রাসায় প্রকৃত ইসলাম শেখানো হয় না, বিজ্ঞান তো নয়ই। আর এখন মুসলমানদের শিখতে হবে বিজ্ঞান — তাই আমরা পড়েছি স্কুলে।

    আমাকে ঘিরে তাঁর আশা ছিল আকাশছোঁয়া। শৈশবে আমি খুব মেধাবী ছিলাম — যেকোনো কিছু একবার পড়লেই মাথায় গেঁথে যেত, আলাদা করে মুখস্থ করতে হতো না। বাবা স্বপ্ন দেখতেন, আমি একদিন অনেক বড় বিজ্ঞানী হব — মুসলমান বিজ্ঞানী।

    নামের উত্তরাধিকার

    বাবার স্বপ্ন শুধু আমাদের ভবিষ্যতে লেখা ছিল না, লেখা ছিল আমাদের নামেও। তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্য ছিল জামায়াতে ইসলামীর প্রতি, আর দুই ছেলের নাম তিনি রেখেছিলেন নিজের নেতাদের নামের সঙ্গে মিলিয়ে। বড় ভাই এ কে এম কামারুজ্জামান মাসুম — জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের নামে। আর আমি এ বি এম আশরাফুজ্জামান — একাত্তরের আলবদর নেতা আশরাফুজ্জামান খানের নামে। জন্মের দিনই আমাদের গায়ে পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুটো জামা, যা আমাদের মাপে কাটা নয়, কাটা অন্য দুই মানুষের মাপে।

    আশরাফুজ্জামান খান — একাত্তরের ডিসেম্বরে যাঁর দল ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, আর যাঁদের আর কখনো ফিরতে দেওয়া হয়নি। দুই হাজার তেরো সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

    কিন্তু সেই আনুগত্য দূর থেকে দেওয়া নিছক সমর্থন ছিল না। ফুপুর মুখে শুনেছি — একাত্তরে বাবা ছিলেন ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার মানুষ, পড়তেন কোনো এক মাদ্রাসায়, আর করতেন ইসলামী ছাত্রসংঘ — জামায়াতের সেই ছাত্র সংগঠন, একাত্তরে যার কর্মীদের নিয়েই গড়ে উঠেছিল আলবদর বাহিনী। বাহাত্তরে তাঁর নামে হুলিয়া জারি হয়। শুনেছি, সেসময়ের মুক্তিযোদ্ধারা ঘোষণা দিয়েছিলেন — জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে বারো হাজার টাকা পুরস্কার। একজন মানুষের দাম, জীবিত কিংবা মৃত, বারো হাজার টাকা। প্রাণ বাঁচাতে বাবা ত্রিশাল ছেড়ে পালিয়ে এলেন দেশের আরেক প্রান্তে, সুনামগঞ্জে।

    একাত্তরে তিনি ঠিক কী করেছিলেন, আমি জানি না। কোনো আদালতের রায়ে, কোনো সরকারি তালিকায় এখন পর্যন্ত তাঁর নাম আমি খুঁজে পাইনি। যা আছে, তা কেবল ফুপুর মুখের কয়েকটা বাক্য, একটা হুলিয়া আর বারো হাজার টাকার একটা দাম। তবু এটুকু জানি: যে নাম তিনি আমাকে দিয়েছিলেন, সেটা কোনো দূরের বীরের নাম ছিল না; ছিল তাঁর নিজের সংগঠনের, নিজের সময়ের এক নেতার নাম। যে অতীত তিনি ত্রিশালে ফেলে এসেছিলেন, তার একটা স্মারক তিনি জড়িয়ে দিয়েছিলেন আমার গায়ে।

    সুনামগঞ্জে এসে সেই পলাতক যুবক হয়ে উঠলেন মতিন মাস্টার — প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, হোমিওপ্যাথির চিকিৎসক, বইভর্তি আলমিরার মালিক। বসন্তপুরের যে গ্রামের গল্প দিয়ে এ লেখা শুরু করেছিলাম, তার মাটির নিচে তাহলে চাপা পড়ে আছে আরেকটা জনপদ — ত্রিশাল। আর যে মানুষ নিজে মাদ্রাসায় পড়েছিলেন, তিনিই বলতেন মাদ্রাসায় প্রকৃত ইসলাম শেখানো হয় না, ছেলেদের পাঠিয়েছিলেন স্কুলে। সেটা কি কেবল ধর্মতত্ত্বের বিশ্বাস ছিল, নাকি নিজের অতীত থেকে ছেলেদের দূরে রাখার এক নিঃশব্দ চেষ্টা — এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।

    যে ছেলেকে বাবা বুদ্ধিজীবীদের ঘাতকের নাম দিয়েছিলেন, সেই ছেলেই বড় হয়ে কলম ধরল, কবিতা লিখল, ব্লগে ধর্মকে প্রশ্ন করল — হয়ে উঠল ঠিক সেই জাতের মানুষ, একাত্তরে যাদের নামে তালিকা বানানো হতো। দুই হাজার পনেরোয় যখন নিলয়কে কুপিয়ে মারা হলো আর আমাকে দেশ ছাড়তে হলো, তখন চাপাতিগুলো এসেছিল সেই পুরোনো মতাদর্শেরই নতুন হাত থেকে। বাহাত্তরে বাবা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়েছিলেন, কারণ মুক্তিযোদ্ধারা তাঁকে খুঁজছিল; তেতাল্লিশ বছর পর তাঁর ছেলে প্রাণ বাঁচাতে পালাল, কারণ বাবার মতাদর্শের উত্তরসূরিরা তাকে খুঁজছিল। একই পলায়ন, কেবল উল্টো দিক থেকে। সেই বছরেই ফাঁসি হয় কামারুজ্জামানের — আমার বড় ভাইয়ের নামের মানুষটির। ইতিহাস যেন একই বছরে একই পরিবারের দুটো নামের হিসাব একসঙ্গে মিটিয়ে দিতে চেয়েছিল, দুই উল্টো দিক থেকে।

    একদিন আমি সেই নামটা খোলসের মতো ছেড়ে এসেছি — হয়েছি পৃথু, আর স্যান্যাল। সে গল্প অন্য অধ্যায়ের। এখানে শুধু এটুকু বলে রাখি: আমার জীবনের প্রথম জবানবন্দি আমি নিজে দিইনি; সেটা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল আমার নামে, আমার হয়ে, আমার জন্মের দিনই।

    তাঁর স্বপ্নে দুটি শব্দ ছিল, পাশাপাশি, হাত ধরাধরি করে — ‘মুসলমান’ আর ‘বিজ্ঞানী’। বিজ্ঞানের পথে আমাকে তুলে দিয়েছিলেন তিনি নিজেই। শুধু জানতেন না, সে পথ কোথায় গিয়ে থামে — কিংবা আদৌ থামে কি না। দ্বিতীয় শব্দটিই যে একদিন প্রথমটিকে ভেঙে দেবে, সে কথা বাবার বইভর্তি আলমিরার কোনো পাতায় লেখা ছিল না।

    (চলমান)

  • অনুসন্ধিৎসু বালকের অভিযান

    অনুসন্ধিৎসু বালকের অভিযান

    একটা শিশুর পায়ের তলায় মাটি যেন কথা বলে ওঠে, প্রতিটা ধুলোকণা ফিসফিস করে বলে — এইখানেই থেমো না। বাড়ির চৌকাঠ তখন একটা সীমান্তরেখা, যার ওপারে না গেলে গোটা পৃথিবীটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায় বলে মনে হয়। এই ফিসফিসানি শুনেছিলাম বহু আগে, বোধহয় ভাষা শেখারও আগে, আর সারাজীবন সেই ডাক আমাকে টেনে নিয়ে গেছে দরজার বাইরে — কখনো নিছক কৌতূহলে, কখনো প্রেমের দুঃসাহসে, কখনো ক্ষোভে সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলার মতো এক ভয়ংকর নীরবতায়। কিন্তু প্রতিটা পরবর্তী পালানোর গায়ে লেগে ছিল প্রথম পালানোরই ছায়া — সেই পাঁচ-ছয় বছরের বালক, যে শুধু একটা গ্রাম দেখবে বলে নিঃশব্দে হেঁটে বেরিয়ে পড়েছিল।

    যেনো একটা পথ, যার শুরু কোথাও নেই,
    যেনো একটা ডাক, যার উৎস কেউ জানে না —
    শুধু পা জানে, হাঁটতে হবে,
    উঠোন ফুরোলেই যেখানে পৃথিবী শুরু।

    জলিলপুর: প্রথম অভিযান

    বসন্তপুর বাজারের হাটুরে আড্ডাটাই ছিল আমাদের ছোট্ট পৃথিবীর একমাত্র সংবাদ সংস্থা। সেখানেই একদিন কানে আসে একটা নাম — জলিলপুর, আর তার গায়ে জড়ানো একটা ফিসফিসে রহস্য: সেই গ্রামে, স্কুলের গা ঘেঁষে, থাকেন এক স্যার, যাকে মানুষ সন্তর্পণে বলে নাস্তিক। শব্দটার অর্থ তখনও অজানা, কিন্তু অজানা শব্দই বুঝি সবচেয়ে বেশি টানে। পাঁচ কি ছয় বছরের একটা বালকের কাছে এই একরত্তি গুজবই যথেষ্ট হয়ে ওঠে একটা গোটা মহাদেশ আবিষ্কারের ডাক হয়ে উঠতে।

    ঘরে বললে কেউ নিয়ে যাবে না, বরং আটকে দেবে — এই সহজ সমীকরণ বালকবুদ্ধিতেও স্পষ্ট। তাই কাউকে না জানিয়েই, বসন্তপুর বাজার থেকে বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তা ধরে পা বাড়াই। বিকেলের কোনো নিরালা মুহূর্তে একটা ছোট্ট মাঠ ডিঙিয়ে পৌঁছে যাই জলিলপুরে।

    গ্রামটা যেন নিজের গ্রামেরই বিপরীত প্রতিচ্ছবি। বসন্তপুরের রাস্তা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেলেও ঘরবাড়ি থাকে দূরে সরে, খোলামেলা এক বিন্যাসে। জলিলপুরে উল্টো ছবি — বাড়িঘর দাঁড়িয়ে রাস্তার দুই কাঁধ ছুঁয়ে, মাথার ওপর গাছের ছায়া জড়াজড়ি করে বানিয়ে তুলেছে সবুজ এক সুড়ঙ্গ, যেন গ্রামটা নিজেকে আড়াল করে রেখেছে অচেনা চোখ থেকে। সেই সুড়ঙ্গ ধরে হাঁটতে হাঁটতে বারবার মনে হয়, এই বুঝি বাঁকের ওপারেই স্কুল — কিন্তু বাঁক ফুরোলে আসে আরও ছায়া, আরও নিভৃত পথ।

    শেষমেশ একটা পাড়া ফুরোলে চোখে পড়ে একচিলতে মাঠ, আর তার ওপারে, গ্রাম-গা ঘেঁষে দাঁড়ানো সেই স্কুল — লজ্জাবতী লতার মতো নিজেকে গুটিয়ে রাখা একটা একলা দালান। বসন্তপুরের দুই-দালানের স্কুল দেখা চোখে এই এক-দালান বড় বেশি বিনয়ী, বড় বেশি সাধারণ মনে হয়। তখনো জানা ছিল না, বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রাইমারি স্কুলই এমন, একটামাত্র দালান নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে নিঃসংকোচে।

    সেই নাস্তিক স্যারের সাথে দেখা হলো না, কথাও না। রহস্য রহস্যই রয়ে গেল সেদিন — আর এখন মনে হয়, হয়তো এটাই ভালো হয়েছিল। কিছু কৌতূহল অপূর্ণ থাকলেই বেঁচে থাকে; উত্তর পেয়ে গেলে যা সেই মুহূর্তেই মরে যায়। স্কুল পেরিয়ে মেঠো আলপথ ধরে কিছুদূর হেঁটে ফিরে আসি বাড়ির পথে, সন্ধ্যা নামার আগেই — কারণ সন্ধ্যা পেরোলে যে বিপদ, তা বালকবুদ্ধিতেও স্পষ্ট ছিল।

    যেনো রহস্য একটা বন্ধ দরজা,
    খুলে ফেললেই যার আলো নিভে যায় —
    তাই বালক ফিরে আসে দরজার সামনে থেকেই,
    রহস্যকে অক্ষত রেখে, নিজেকে অতৃপ্ত রেখে।

    এই ছিল আমার প্রথম স্মৃতি — বাড়িতে না বলে দূরের কোনো গ্রাম দেখতে যাওয়ার প্রথম অভিযান। ছোট্ট এক পদযাত্রা, অথচ তার ভেতর ঘুমিয়ে ছিল আজীবনের একটা প্রবণতার প্রথম শ্বাস।

    শক্তিয়ার খলা বাজার: মিছিলের ছদ্মবেশে

    আমাদের বাড়িতে তখন কাজ করত আব্দুল মান্নান নামের একটা কিশোর ছেলে। বাবা তার চোখে একটা সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন, আর তাই কাজের পাশাপাশি স্কুলেও পড়ার সুযোগ করে দেন তাকে। এই দাক্ষিণ্য মান্নান আর তার পরিবারকে বাবার প্রতি এক ধরনের অন্ধ ভক্তিতে বেঁধে ফেলে, দুই বাড়ির মধ্যে শুরু হয় নিয়মিত আসা-যাওয়া। এই সম্পর্কের নিচে অবশ্য আরেকটা স্রোতও বইছিল — বাবা তখন জামাতের সাংগঠনিক বিস্তারে ব্যস্ত, মানুষ বাড়ানোর তাগিদে সম্পর্কের জাল বুনে চলতেন চারপাশে, আর মান্নানের সম্ভাবনা দেখেই তাকে নিয়ে টার্গেট শুরু করেছিলেন। সেই লক্ষ্যে বাবা সফলও হয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত — মান্নান আজ জামাত করে, বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংকে বড় পদে বসে আছে। তার বিস্তারিত গল্প তোলা থাক অন্য কোনো অধ্যায়ের জন্য।

    একদিন মান্নানদের বাড়িতে গিয়ে দিগন্তজোড়া মাঠের ওপারে চোখে পড়ে একটা রক্তলাল দালান, যেন মাঠের সবুজের মাঝে কেউ একফোঁটা রক্ত ফেলে দিয়েছে। জিজ্ঞেস করে জানা যায়, ওটা পরিবার পরিকল্পনা অফিস আর গ্রাম স্বাস্থ্য কেন্দ্র, জায়গাটার নাম শক্তিয়ার খলা বাজার। সেই লাল দালান দেখার কৌতূহল বুকের ভেতর পুষে রাখি, সুযোগের অপেক্ষায় — কারণ কৌতূহল তো এমনই, একবার জন্ম নিলে সহজে মরে না, শুধু সুযোগের জন্য ঘাপটি মেরে বসে থাকে।

    সুযোগ আসে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়ায়। কোনো এক প্রার্থীর সমর্থনে একটা মিছিল যাচ্ছিল গ্রামের রাস্তা ধরে, আর মিছিলের সেই হৈ-হুল্লোড়, সেই উৎসবের ঘোর আমাকে টেনে নেয় ভিড়ের ভেতর। শুনি, মিছিল যাবে শক্তিয়ার খলা পর্যন্ত, তারপর ফিরে আসবে। মাথায় চট করে বুদ্ধি খেলে যায় — এই তো সুযোগ, ভিড়ের আড়ালে লুকিয়ে সেই লাল দালান ছুঁয়ে আসা। মিছিলের সাথে থাকলে হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই, ভয় নেই ছেলেধরার গল্পেরও — একটা সংগঠিত ভিড় নিজেই যেন একটা রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে একলা এক বালকের জন্য।

    মিছিল এগোয় বসন্তপুর বাজার পেরিয়ে উলাসনগরের ওপর দিয়ে — সে গ্রামে থাকতেন মোড়ল, আর মোড়লবাড়ি দেখার সাধ ছিল বহুদিনের, সেটাও মিছিলের ফাঁকে একঝলক দেখা হয়ে যায়। তারপর মিছাখালি নামের এক নদী, যে নদী বর্ষায় ফুলে ওঠে, শীতে শুকিয়ে হয়ে যায় চরের মতো নিরুপায়। নদী পেরিয়ে পেটনা, তারপরেই কাঙ্ক্ষিত শক্তিয়ার খলা। শীতকাল তখন, আর মিছাখালির এপার থেকেই প্রথম দেখা মেলে সেই লাল দালানের — দূর থেকে যতটা রক্তলাল মনে হয়েছিল, কাছে গিয়ে ততটাই বিশাল, ততটাই দুর্গম।

    শিশুর চোখে কী বিস্ময়! একটা বাড়ি এত লাল হতে পারে, আর এত বড়ও! কিন্তু দুঃখের কথা, দালানের চত্বরে পা পড়ে না — একে তো মিছিলের সাথে বাঁধা পড়া শরীর, তার ওপর চত্বরটা ঘেরা কাঁটাতারের বেড়ায়, জীবনের প্রথম কাঁটাতার দেখা সেদিনই। আমাদের গ্রামের বাড়িঘরে বেড়া বলতে কিছু ছিল না, থাকত শুধু সুপারি পাতার বা ঝোপঝাড়ের নরম আড়াল, প্রবেশের জন্য একটা দেউড়ি। অথচ এই দালানের সীমানায় লোহার এক বিশাল গেট, আর তার পাশ ঘিরে ধারালো তারের বুনন — যেন প্রথমবার বোঝা যায়, রাষ্ট্র নামের জিনিসটা মাটির দেউড়ির চেয়ে অনেক বেশি কঠিন, অনেক বেশি দূরত্বপ্রিয়।

    যেনো একটা বেড়া, একলা দাঁড়িয়ে বলে —
    এইখানে থামো, এর বেশি নয় —
    অথচ বালকের চোখে বেড়াটাই আরেকটা রহস্য,
    আরেকটা না–দেখা দেশের সীমান্তরেখা।

    মিছিলের সাথেই ফিরি বসন্তপুর বাজারে, যেখানে শেষে বিতরণ হয় মুড়ি আর গুড়, ছোট্ট পলিথিনের মোড়কে। সেই মুড়ি-গুড় চিবোতে চিবোতে স্কুলে পা রাখতেই কানে আসে, স্কুলে নাকি পরীক্ষা চলছে! দৌড়ে যাই স্যারের কাছে। লতিফ স্যার হাতে একটা প্রশ্ন ধরিয়ে দিয়ে নাম লিখতে বলেন, আরও কী কী যেন লিখতে বলেন, সাথে দুই আর দুইয়ের যোগফল কষতে বলেন। কাজ সেরে ফেলার পর কাগজটা হাতে ধরিয়ে বলেন, “মাকে দিয়ে বলবে, তুমি পাস।” সেই আনন্দের কোনো ভাষা হয় না — লাফাতে লাফাতে, দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি ফিরে মাকে কাগজ দেখিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকি, আমি পাস, আমি পাস।

    কিন্তু আনন্দের আয়ু বড় কম। কিছুদিন পর স্কুল শুরু হলে ক্লাসে গিয়ে হতাশ হই — রোল ডাকার সময় নাম প্রথমে ওঠে না আমার। প্রথমে ডাকা হয় শহিদ মিয়া নামের একটা ছেলেকে, তারপর আমাকে — রোল দুই। সেই মুহূর্তেই মনের গভীরে গেঁথে যায় একটা জেদ, নীরব অথচ অনড় — এক হতেই হবে। পরের বছর থেকে সেই প্রাইমারি স্কুলে আর কখনো দ্বিতীয় হইনি। লাল দালানের কাঁটাতার যেমন শিখিয়েছিল, সীমানা মানেই সমাপ্তি নয়, বরং আরেকটা প্রশ্নের শুরু — তেমনি রোল দুই হওয়ার সেই ছোট্ট আঘাতও শিখিয়ে দেয়, প্রথম হওয়া মানেই শেষ কথা নয়, বরং একটা নতুন তাড়নার প্রথম বীজ।

    বিশ্বম্ভরপুর: টাওয়ারের প্রথম দর্শন

    আমাদের থানা শহর বিশ্বম্ভরপুরের কথা কানে আসত লোকমুখে, প্রায় রূপকথার মতো — সেখানে নাকি পাকা রাস্তা আছে, একটা হাই স্কুল আছে, আছে অসংখ্য সরকারি অফিস, আর আছে অফিসার্স কোয়ার্টার নামের এক রহস্যময় শব্দবন্ধ, যার অর্থ তখনও অধরা, কিন্তু ঠিক সেই অজানাটুকুই কৌতূহলকে দ্বিগুণ করে তুলত। প্রশ্ন ছিল একটাই — সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরের সেই শহর কীভাবে দেখা যায়।

    বলে রাখা ভালো, আমার জন্ম এমন এক পাড়াগাঁয়ে, যে গাঁ থেকে আজ, এই ২০২৬ সালেও, জেলা শহরের সাথে কোনো পাকা যোগাযোগ নেই। গ্রামের ভেতরের রাস্তাটুকুও আজও কাঁচা, মাটির। দূরের শহরে পৌঁছাতে ভরসা ছিল মেঠো পথ, বাহন বলতে পা আর সাইকেল, বর্ষায় শুধু নৌকা। সময় যেন এই গ্রামের সীমানায় এসে একটু ধীর হয়ে গেছে, আজও।

    সুযোগ আসে স্কুলের এক ঘোষণায় — থানা শিক্ষা অফিস থেকে পাঠ্যবই আনার জন্য ছাত্র বাছাই হচ্ছে। রীতি ছিল, ক্লাস ফাইভের বড় ছাত্ররা মাথায় বই বয়ে আনবে, পরে বিতরণ হবে ছোটদের মধ্যে। ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি তখন, আমি সবে ক্লাস থ্রিতে। বয়সে ছোট বলে স্যার প্রথমে দলে নিতে নারাজ — এ কাজ শুধু ফাইভের ছাত্রদের জন্য। কিন্তু বায়নার কাছে স্যারও শেষমেশ নরম হন খানিকটা, বলেন বাড়ির অনুমতি আনতে।

    অনুমতি মিলবে না, তা ভালোই জানা — ততদিনে বাড়ির কড়াকড়ির বেড়াজাল বালকমনেও গেঁথে গিয়েছিল গভীরভাবে। তাই যেদিন ছাত্ররা রওনা হবে, নিঃশব্দে তাদের সঙ্গ নিই। ছাত্ররা প্রথমে গা করে না, বলে স্যারের অনুমতি লাগবে। জবাবে একটা ছোট্ট মিথ্যা বুনে দিই — স্যার আর বাড়ি, দুইয়েরই অনুমতি আছে। ভাগ্য ভালো, স্যার আগেই অফিসিয়াল কাজে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, ছাত্ররা যাচ্ছিল পরে, একা। মোবাইল ফোনহীন সেই যুগে তাৎক্ষণিক যাচাইয়ের কোনো উপায়ও ছিল না — মিথ্যাটা তাই নিরাপদে বেঁচে যায়।

    পথের একাংশে হাঁটুজলের কাদা, হয়তো সাম্প্রতিক বৃষ্টির জের। সেই কাদা ডিঙিয়ে ছাত্রদের সাথে সাথে হাঁটি, চোখে নতুন মাঠ, নতুন গ্রাম, প্রতিটা বাঁকে নতুন আবিষ্কারের শিহরন। এই পথেই প্রথম দেখা মেলে মহিষে টানা এক ঠেলাগাড়ির, বাঁশের বোঝা নিয়ে চলেছে বিশ্বম্ভরপুর বাজারের দিকে, মন্থর, ভারী পায়ে, যেন শতাব্দীর পুরনো একটা ছন্দ বহন করে চলেছে কাদাপথ ধরে।

    দুইটা মাঠ পেরোতেই দিগন্তরেখায় জেগে ওঠে আরেক বিস্ময় — দূর আকাশে দাঁড়িয়ে একটা বিশাল টাওয়ার। জিজ্ঞেস করি সঙ্গীদের, জানা যায় ওটা টি অ্যান্ড টি অফিসের টাওয়ার, যা দিয়ে টেলিফোন চলে। সেই একই মেঠো পথে, একই বিকেলে, একদিকে মহিষে টানা গাড়ির আদিম ছন্দ, অন্যদিকে আকাশ ছোঁয়া টেলিফোন টাওয়ারের ভবিষ্যৎ-ইশারা — দুই যুগ যেন হাত ধরাধরি করে হাঁটছিল একই কাদাপথে, বালকচোখেও যা একটা অদ্ভুত, নাম-না-জানা দ্বন্দ্ব হয়ে ধরা দেয়। সেই টাওয়ারই পরবর্তী জীবনে হয়ে ওঠে বিশ্বম্ভরপুরের ব্যক্তিগত ল্যান্ডমার্ক — যতবার সেই শহরমুখী হয়েছি, দূরের কোনো গ্রাম থেকে ওই টাওয়ার চোখে পড়লেই মনে হয়েছে, ঐ তো বিশ্বম্ভরপুর, ঐ তো ভবিষ্যতের ইশারা।

    যেনো একটা টাওয়ার আকাশ ফুঁড়ে বলে —
    এসো, শব্দকে বন্দী করা যায় তারে,
    অথচ পাশ দিয়ে মহিষের গাড়ি চলে যায় নিঃশব্দে,
    যেন সময়ের দুই প্রান্ত একই পথে হাঁটে, কথা না বলেই।

    সেদিন ছাত্রদের সাথে সারাদিন ঠিক কী করেছিলাম, আজ আর স্পষ্ট মনে নেই। স্মৃতিতে টিকে আছে শুধু বিস্ময়ভরা চোখ — পাকা রাস্তা, তার পাশে সার বেঁধে দাঁড়ানো সরকারি কোয়ার্টারের পাকা দালান। শুনি, সরকারি চাকরি পেলেই ওসব দালানে থাকা যায়, আর সরকারি চাকরি পেতে হলে চাই লেখাপড়া — একটা সহজ সমীকরণ, যা বালকমনে গেঁথে যায় সেদিনই, যদিও তার পূর্ণ মানে বুঝতে লেগে যাবে আরও অনেক বছর। হাই স্কুলের ভেতরে যাওয়া হয়নি, ওটা ছিল মূল রাস্তা থেকে দূরে, তবে দূর থেকেই দেখা হয় তার বিশাল দালান আর বিস্তৃত মাঠ।

    সুনামগঞ্জ শহর: সুরমা পেরিয়ে

    সুনামগঞ্জ শহরের কথাও কানে আসত লোকমুখে, আরও বড় এক রূপকথা হয়ে — ওটা জেলা শহর, বিশ্বম্ভরপুরের চেয়েও ঢের বড়, অজস্র পাকা রাস্তা, চারদিকে দালানের সারি, গলি-ঘুপচি, অসংখ্য গাড়ি-যানবাহনের কোলাহল। বাবা মাঝেমধ্যে সেই শহরে যেতেন জামাতের কাজে, অফিসের কাজে। বায়না ধরতাম সাথে যাওয়ার, কিন্তু সারাদিন এত ছোট একটা ছেলেকে কোথায় রাখা হবে, এই দুশ্চিন্তাতেই হয়তো বাবা রাজি হতেন না। তবু সুযোগ খুঁজে বেড়াতাম মনে মনে, নিঃশব্দে, ধৈর্য ধরে — কৌতূহল তো অপেক্ষা করতে জানে, শুধু ভুলে যেতে জানে না।

    সুযোগ আসে এক দুঃখজনক ঘটনার হাত ধরে। গ্রামে ঘটে যায় একটা হত্যাকাণ্ড, আর তার জেরে বারোজন মানুষকে আসামি করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের কারাগারে। তাদের বউ, মা, আত্মীয়স্বজন ঠিক করেন, কেসের তারিখে শহরে গিয়ে দেখা করে আসবেন। বায়না ধরি আমিও তাদের সাথে যাওয়ার। দলে ছিলেন শাহেদার মা, যার সাথে আমাদের বাড়ির সম্পর্ক গভীর, আর মা-বাবার চোখে যিনি ছিলেন দায়িত্বশীল, ভরসাযোগ্য। বুঝেছিলাম, তার হাত ধরে গেলে বাড়িতে জানলেও অতটা বকাবকি জুটবে না।

    ঘরে জানাই, বায়নাও ধরি, তবু তেমন পাত্তা পাই না। যেদিন তারা রওনা হবেন, ভোরের প্রথম আলোতেই গিয়ে হাজির হই শাহেদার মায়ের দুয়ারে — আমিও যাব। তিনি প্রথমে গররাজি, তখন একটা কৌশলী মিথ্যায় নিজেকে সাজাই — ঘরে বলেই এসেছি, বাবার কাছ থেকেই ফিরব শহর থেকে, যেহেতু বাবাও যাচ্ছেন কেসের কাজেই, তিনিই তো সেই বারোজন আসামির অভিভাবকের মতো, তিনিই উকিল ঠিক করেছেন, কোর্ট-কাচারির খোঁজ রাখছেন।

    সাড়ে তিন ঘণ্টার সেই হাঁটাপথ শুরু হয় মেঠো সুর ধরে, বিশ্বম্ভরপুরের পাশের গ্রামগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে — গণ্ডামারা, চান্দেরগাঁও, বোয়ালিয়া, কারেন্টের বাজার, পলাশ। পথের কোথাও কোথাও ব্রিটিশ আমলের এক ভাঙা পাকা রাস্তার কঙ্কাল চোখে পড়ে — পিচ উঠে গিয়ে খোয়া-পাথর ছড়িয়ে আছে, আর কিছুদূর পরপর পড়ে আছে পরিত্যক্ত পিচের ড্রাম, সমান করার কাজে লাগা ভারী রোলারের কিছু চিহ্ন। যন্ত্রপাতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তির কারিগরি — আরেকবার বালকচোখে বিস্ময়ের ঝলক, যদিও এবার সেই বিস্ময় দাঁড়িয়ে ছিল একটা ভাঙনের গায়ে, একটা সাম্রাজ্যের ফেলে যাওয়া কঙ্কালের ওপর।

    আড়াই ঘণ্টা হাঁটার পর দল বিশ্রাম নেয় এক মাঠে। দলে শুধু মহিলারা, জনা দশ-বারো। যার যার কাপড়ের কোঁচড় থেকে, গাঁটরি থেকে বেরিয়ে আসে খাবার — কারও রান্না করা ভাত-তরকারি, কারও শুকনো রুটি। সবাই মিলে ভাগ করে খায়, তারপর আবার পথ। খাবার সাথে নেওয়ার এই সহজ প্রজ্ঞাটা সেদিনই প্রথম মাথায় ঢোকে, অথচ নিজে কোনো খাবার না নিয়েই সেই যাত্রা করেছিলাম বলে হয়তো আজও কোথাও বেরোনোর আগে পথের খাবার নিয়ে বিশেষ ভাবি না — কিছু অভ্যাস জন্ম নেয় অনুপস্থিতি থেকেই।

    বিশ্বম্ভরপুর ছাড়িয়ে পরের গ্রাম থেকেই সুনামগঞ্জের আকাশে জেগে ওঠে আরেকটা টাওয়ার, আগেরটার চেয়ে ঢের বড়, ঢের অহংকারী। বিশ্বম্ভরপুরেরটা ছিল নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত সমান্তরাল, নিরহংকার এক রেখা; এটা নিচে চওড়া, ওপরে ক্রমশ সরু, মাথায় বসানো ড্রামের মতো বিশাল অ্যান্টেনা, যেন আকাশের সাথেই কথা বলছে। বালকচোখে আবারও বিস্ময়ের ঝলক, তবে এবার তার সাথে মিশে যায় একটা চাপা ভয়ও — এত বড় শহর, তার আগেই এত বড় ইশারা।

    সুরমা নদীর পাড়ে পৌঁছাতেই নদীর ওপারে দেখা যায় সুনামগঞ্জ শহর — নদীতীর ঘেঁষে ছুটে চলা শত শত রিকশা, এপার থেকেই শোনা যায় মানুষের কোলাহল, যানবাহনের গুঞ্জন। হাতে বাওয়া নৌকায় নদী পার হই, আর সেই পারাপারেই প্রথমবার ভয়ের সাথে সত্যিকার মুখোমুখি হই — নৌকা যাত্রীতে ঠাসা, পানি কানায় কানায়, মনে মনে প্রশ্ন জাগে, যদি ডুবে যায়! সেই আশঙ্কা বুকের ভেতর দানা বাঁধে, তবু নৌকা নিরাপদে তীরে ভেড়ে, যেন ভয় নিজেই একটা পরীক্ষা ছিল, যা পার হতে হয় নীরবে।

    যেনো একটা নদী, যার বুকে ভাসে ভয়,
    আর সেই ভয়ের ওপর দিয়েই পার হতে হয় বড় হওয়া —
    কানায় কানায় পানি, তবু ডোবে না নৌকা,
    শুধু কাঁপে বুক, নিঃশব্দে, কাউকে না জানিয়ে।

    শহরে পা রাখতেই কানে বাজে অজস্র কাকের ডাক — শহরে এত কাক থাকে! চারদিকে ছড়ানো ময়লা, নাকে লাগা এক অস্পষ্ট দুর্গন্ধ, যা আজ আর হুবহু মনে নেই। নদী পেরিয়ে শহরের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই জেলখানার সামনে, তার দেয়াল ঘেঁষে সার বেঁধে দাঁড়ানো অসংখ্য দোকান, বেশিরভাগ খোলা দোকান, তার মধ্যেও সবচেয়ে বেশি পান-সুপারির পসরা।

    পথের মাঝামাঝি কোথাও, খাবার বিরতির কিছুক্ষণ পরে, বাবার সাথে দেখা হয়ে যায় রাস্তায় — তিনি আসছিলেন সাইকেলে চড়ে। বাড়িতে জানা হয়ে গিয়েছিল যাত্রার খবর, তাই ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিলেন বড় ভাইয়ের একটা প্যান্ট — নিজের কোনো লম্বা প্যান্ট ছিল কিনা, আজ আর স্পষ্ট মনে নেই। তবে স্পষ্ট মনে আছে, বাবা তিরস্কার করতে করতেই সেই প্যান্ট পরিয়ে দিয়েছিলেন, নিচ থেকে ভাঁজ করে করে তুলে দিয়েছিলেন যেন পা বেরিয়ে থাকে — বকুনি আর যত্ন যেন একই হাতের দুই আঙুল, আলাদা করা যায় না। বাকি পথ কাটে বাবার সাইকেলের সামনের রডে বসে, সারাদিন বাবার সাথেই থাকি, মাঝে একবার আবার রেখে যাওয়া হয় সেই মহিলাদের দলের কাছে।

    সুনামগঞ্জ শহরে প্রথমবার দেখা মেলে চার চাকার আধুনিক গাড়ির, বিশেষত অনেকগুলো জিপ। চারপাশে মানুষের ঢল, কোলাহল, দোকানপাট, রিকশা, সাইকেল, ছেলেমেয়েদের দৌড়াদৌড়ি। সেবারই প্রথম দেখি একটা মেয়ে ছোট্ট একটা সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে, অবলীলায়, যেন শহরটাই তার নিজের উঠোন — বালকচোখে নেমে আসে বিস্ময়ের এক গোটা রাজ্য। এই বুঝি শহর, শহর তাহলে এমনই হয়!

    জলিলপুরের সেই প্রথম, নিরীহ পদযাত্রা থেকে সুনামগঞ্জ শহরের এই দীর্ঘ, ঘটনাবহুল অভিযান পর্যন্ত — প্রতিটা যাত্রাতেই কৌশল হয়ে উঠেছে একধাপ জটিল, একধাপ সাহসী। প্রথমবার শুধু একা হেঁটে যাওয়া, দ্বিতীয়বার মিছিলের ভিড়ে নিজেকে মিশিয়ে ফেলা, তৃতীয়বার মিথ্যা অনুমতির ছদ্মবেশ পরা, চতুর্থবার এক বিশ্বস্ত মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে সামাজিক বৈধতা বানিয়ে নেওয়া। প্রতিটা অভিযানের কেন্দ্রে ছিল একই তাড়না — না-দেখা কিছু দেখার তীব্র কৌতূহল, আর সেই কৌতূহলের পথে যা-ই বাধা আসুক, তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার একটা সহজাত দক্ষতা। এই দক্ষতাই হয়তো ঢের আগে থেকেই গড়ে দিয়েছিল পরবর্তী জীবনের আরও অনেক পালানোর, আরও অনেক দুঃসাহসের ভিত।

    যেনো একটা বালক, বারবার হেঁটে যায় সীমানার দিকে,
    প্রতিবার একটু বেশি সাহস নিয়ে, একটু কম ভয় নিয়ে —
    আর প্রতিটা সীমানা পেরোনোর পরে বুঝতে পারে,
    সীমানা তো আসলে ছিলই না, শুধু মনের বানানো একটা রেখা।

  • আশা

    আশা

    বিভ্রান্তির চড়ে বাসা বেধেছে
    কতো বিবর্ণ শালিক।
    ধূমকেতু স্বপ্নেরা তথাপি
    জানান দিয়ে যায়।
    বলে, চোখ রেখো,
    অসীম আকাশের দিকে,
    খোলা জানালায়।
    স্বপ্নেরা সত্যি হয়ে,
    যদি কখনো
    মিলে যায়!

  • ইচ্ছে

    ইচ্ছে

    মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে,
    বিস্ফোরিত হই, চিৎকার করি।
    চিৎকার করে বলি,
    এই বিশ্ব চরাচরে কেউ ভাল নেই,
    নবজাতক শিশুটি থেকে শুরু করে
    মৃতবত বৃদ্ধটি, কেউ ভাল নেই।

    ইচ্ছে করে কোন এক পর্বতের চূড়ায়
    নিঃসঙ্গ যাত্রীর মত চুপিচুপি উঠে গিয়ে
    দিগ্বিদিক বিদীর্ণ করে চিৎকার করি,
    চিৎকার করে বলি,
    মানুষেরা কেউ কারও নয়।

    ইচ্ছে করে চৌরাস্থার পাগলটির মত,
    বুক চাপড়ে চাপড়ে বলি,
    পৃথিবীর সকল মানুষেরা হারামি।
    পারি না, চিৎকার করতে পারি না,
    চারদিক থেকে টুটি চেপে ধরে,
    সম্পর্কের দালালেরা।
    বে-পাড়ার বেশ্যাটি থেকে শুরু করে,
    ঘরের বধুটি, বাবুটি।
    সকলেই টুটি চেপে ধরে।
    বলে, চেপে যা হারামজাদা।

    আমি চেপে যাই,
    ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা বেওয়ারিশ কুকুরটির মত
    ঝিমাই।

    একা একাই বিরবির করি,
    কেউ ভাল নেই,
    মানুষেরা কেউ কারও নয়,
    মানুষেরা একেকটা আস্ত হারামি,
    আর আমি এক জলজ্যন্ত হারামজাদা।

  • আমি ঈশ্বরের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম

    আমি ঈশ্বরের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম,
    আমি মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম।
    মানুষই আমার ঈশ্বর।
    ওরা দাঁড়িয়েছিলো মোহাম্মদের পক্ষে।
    আর বরাবরের মতোই
    দুর্ধষ মোহাম্মদ আর তার অনুসারীরা
    জয়ী হয়।
    আমি হেরে যাই,
    আমরা হেরে যাই।
    তথাপি
    পরাজিত হই না, হবো না।
    পৃথিবীর ইতিহাসে
    শয়তানের কাছে মানুষ
    কখনোই পরাজিত হয়নি।

  • না পাওয়া ভালোবাসা ভুলো

    না পাওয়া ভালোবাসা ভুলো

    ঐ দেখো,
    দিনের শেষে ঝরে গেছে
    লাল কৃষ্ণচূড়ার ঝাক।
    ফাগুনের লাল পলাশ,
    অথবা
    পথে পড়ে আছে দেখো
    ঐ শিমুলের লাশ।
    .
    ঐ দেখো,
    খসখসে হয়ে গেছে,
    শিশুর নরম তুলতুলে গাল।
    দেখো, ভাল করে দেখো,
    তোমার উদ্ধত বালক আজ
    মাছ চোর মেনি বেড়াল।
    .
    মালবিকা দেখো,
    মুখ তুলো, চোখ খোল,
    এবার তোমার না পাওয়া
    ভালবাসা ভুলো।

  • স্বপ্নের মতন

    স্বপ্নের মতন

    অতঃপর,
    একদিন আসিবে এমন সময়
    খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘর, তার অনতি বৃহৎ বারান্দায়
    সোদা মাটির ‘পরে মাাদুর পেতে মুখোমুখি
    বসবো দু’জনে, তবু স্পর্শ করে নয়।
    আমরা জানিবো আমাদের হৃদয়
    যোজন যোজন দূরত্ব গুছিয়েছিলো,
    মিশেছিলো নববর্ষার জলে পলির মতন।
    আমরা জানিবো আমাদের প্রেম,
    অশরীরি জোসনার মতো আচ্ছন্ন রেখেছিলো।
    অথবা আমাদের ভালোবাসা ছিলো
    সোনামুখী জলের দেশে
    ঝিনুকের বুকের ভেতর কঙ্কাবতীর রতন।
    চারিদিকে জল জঙ্গল, ভেসে যাবে পুর্নিমায়,
    শ্রাবণ শেষের শরৎ আকাশ, অশরীরী মেঘ
    বয়ে যাবে, যেমন করে বয়ে বেরিয়েছে
    যুগ থেকে যুগ; আমাদের ধুসর রঙা ভালোবাসা।
    আমরা
    আমাদের স্বপ্নের মতোন
    আবছা আলোয় চোখ তুলে তাকাবো পরস্পর
    জানিবো, এই চোখ, এই মুখ আমাদের কতো চেনা!
    অতীতের গ্লানি, বিরহ বিচ্ছেদ সবকিছু গুড়িয়ে দিয়ে
    আমাদের স্বপনের মতোন
    সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়ে ভালোবাসা,
    রয়ে যাবো তবু দুজনেই নীরব।
    আমাদের মুখ কহিবে না কিছু,
    নৈশব্দের ভেতর ভেসে যাবে
    বলা না বলা সকল কথোপথন।
    একবার কেটে যাবে ঘোর,
    কেটে যাবে জোসনার রেশ
    নীরবতা ভেঙে দু’জন দু’জনকেই বলবো,
    “ঠিক ঠিক কেটে গেলো রাত
    আমাদের স্বপ্নের মতোন।”

  • বদমাইশের জবানবন্দি

    বদমাইশের জবানবন্দি

    ওরা বলতো সাগুফতা।
    শুনে আমার পিত্তি জ্বলে যেতো।
    শাহ গুফতা।
    কতো সুন্দর একটা নাম।
    অথচ, ওরা বিকৃত করে ডাকতো।
    সুমন ভাইটাও,
    ও নাকি আপার প্রেমিক!
    প্রেমিক হয়ে প্রেমিকার নাম
    ঠিকভাবে নিতে পারে না।
    তখন ইন্টারনেট ছিলো না,
    ছিলো না এখনকার মতো ম্যাসেঞ্জার।
    সুমন ভাই আর শাহ গুফতা আপার
    ম্যাসেঞ্জার ছিলাম আমি।
    শাহ গুফতা
    নামের মতো গুটি গুটি হাতের লেখা ছিলো,
    নামের মতোই লেখায় আভিজাত্য ছিলো।
    সুমন ভাইকে দেবার আগে
    আমি কয়েকবার করে পড়ে নিতাম।
    কল্পনায় সুমন ভাইয়ের বদলে
    আমিই বুনে নিতাম গোপন অভিসার।
    শাহ গুফতা
    নামের মতোই আভিজাত্য ছিলো
    আপার শরীর জুড়ে।
    ছিলো অদ্ভুত এক সৌরভ।
    একদিন
    কি জানি কী মনে করে
    আমাকে কাছে নিয়েছিলেন
    পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে
    ঠিক মাথার উপরে
    আলতো করে চুমুও খেয়েছিলেন।
    এখনও সেখানে হাত বুলাই,
    খুঁজে ফিরি সেই ঠোট।
    কাছাকাছি হতে গিয়ে আমার
    নাক মুখ চোখ স্পর্শ করেছিলো
    শাহ গুফতার নরম বুক।
    এতোটুকুনই।
    অদ্ভুত! অদ্ভুত! অদ্ভুত স্পর্শ।
    এক জীবন পেরিয়ে গেলো তবু,
    সেই স্পর্শ, সেই ঘ্রাণ
    আর ফিরে আসেনি, ফিরে আসেনি
    সেই ডুবে যাবার আকাঙ্ক্ষা।
    শাহ গুফতা।
    সে কি জানে!
    এখনও খুঁজি সেই স্পর্শ,
    সেই ঘ্রাণ।
    যে প্রথম বুনে দিয়েছিলো,
    এ জন্মে নারী প্রাণ, নারী ঘ্রাণ।

  • রাত নেমে এলে

    রাত নেমে এলে

    আমি জানি,
    তোমাদের শহরে রাত নেমে এলে পরে
    একে একে খুলে যায় স্মৃতির দরজাগুলো।
    দরজার চৌকাঠ বেয়ে বেয়ে বের হয়ে আসে
    স্মৃতিতে ডুবে থাকা বিসন্নতা।

    তোমরা ডুবে যাও
    স্মৃতির বিসন্ন সাগরে।
    সাথে ডুবে যায়
    তোমাদের সুখের নৌকাগুলো।
    তোমরা সাতরাতে থাকো
    পানে অথবা পানশালায়।

    অথবা
    যার পানশালা নেই,
    সে ডুবতে চায়
    ইনবক্স নামক আরেক যন্ত্রণায়
    কিছুটা মুক্তির আশায়।

    আমি জানি,
    তোমাদের শহরে রাত নেমে এলে পরে
    তোমরা কাতরাতে থাকো
    পাওয়া না পাওয়ার যন্ত্রণায়।

  • শ্মশানবন্ধু

    শ্মশানবন্ধু

    শ্মশানের শেষ চিতাটি পুড়ে ছাই হবার পর
    আমরা বাড়ীর পথ ধরি।
    আমাদের পথ আটকে দাঁড়ায় মৃতের স্বজনেরা।
    আমরা মিষ্টি মুখ করি।
    মিষ্টি খেতে খেতে আমাদের ভার করে রাখা মুখ,
    হাসিতে ভরে যায়।
    শ্মশানের শেষ চিতাটি পুড়ে ছাই হবার পর
    আমরা বাড়ীর পথ ধরি।
    আমাদের পথ আটকে দাঁড়ায় শ্মশানের সাধুরা,
    আমরা সাধুর কল্কেতে আচমকা টান মারি।
    ধোয়ায় ফুসফুস ভরে গেলে আমাদের মন
    হালকা হয়ে যায়।
    আমরা মৃত্যুর কথা ভুলে যাই।
    মৃতের কথা ভুলে যাই।
    শ্মশানের শেষ চিতাটি পুড়ে ছাই হবার পর
    আমরা বাড়ীর পথ ধরি।
    বাড়ি ফিরি।
    প্রতীক্ষায় থাকি,
    শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণ হাতে পাবার।
    আমরা শ্মশানবন্ধু।
    পেট পুরে শ্রাদ্ধের ভোজন সারি।
    মৃত্যু আমাদের কাছে ভোজনের আরেক নাম।
    মৃত্যু আমাদের কাছে মিষ্টিমুখ, কল্কেতে টান।