একটা শিশুর পায়ের তলায় মাটি যেন কথা বলে ওঠে, প্রতিটা ধুলোকণা ফিসফিস করে বলে — এইখানেই থেমো না। বাড়ির চৌকাঠ তখন একটা সীমান্তরেখা, যার ওপারে না গেলে গোটা পৃথিবীটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায় বলে মনে হয়। এই ফিসফিসানি শুনেছিলাম বহু আগে, বোধহয় ভাষা শেখারও আগে, আর সারাজীবন সেই ডাক আমাকে টেনে নিয়ে গেছে দরজার বাইরে — কখনো নিছক কৌতূহলে, কখনো প্রেমের দুঃসাহসে, কখনো ক্ষোভে সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলার মতো এক ভয়ংকর নীরবতায়। কিন্তু প্রতিটা পরবর্তী পালানোর গায়ে লেগে ছিল প্রথম পালানোরই ছায়া — সেই পাঁচ-ছয় বছরের বালক, যে শুধু একটা গ্রাম দেখবে বলে নিঃশব্দে হেঁটে বেরিয়ে পড়েছিল।
যেনো একটা পথ, যার শুরু কোথাও নেই,
যেনো একটা ডাক, যার উৎস কেউ জানে না —
শুধু পা জানে, হাঁটতে হবে,
উঠোন ফুরোলেই যেখানে পৃথিবী শুরু।
জলিলপুর: প্রথম অভিযান
বসন্তপুর বাজারের হাটুরে আড্ডাটাই ছিল আমাদের ছোট্ট পৃথিবীর একমাত্র সংবাদ সংস্থা। সেখানেই একদিন কানে আসে একটা নাম — জলিলপুর, আর তার গায়ে জড়ানো একটা ফিসফিসে রহস্য: সেই গ্রামে, স্কুলের গা ঘেঁষে, থাকেন এক স্যার, যাকে মানুষ সন্তর্পণে বলে নাস্তিক। শব্দটার অর্থ তখনও অজানা, কিন্তু অজানা শব্দই বুঝি সবচেয়ে বেশি টানে। পাঁচ কি ছয় বছরের একটা বালকের কাছে এই একরত্তি গুজবই যথেষ্ট হয়ে ওঠে একটা গোটা মহাদেশ আবিষ্কারের ডাক হয়ে উঠতে।
ঘরে বললে কেউ নিয়ে যাবে না, বরং আটকে দেবে — এই সহজ সমীকরণ বালকবুদ্ধিতেও স্পষ্ট। তাই কাউকে না জানিয়েই, বসন্তপুর বাজার থেকে বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তা ধরে পা বাড়াই। বিকেলের কোনো নিরালা মুহূর্তে একটা ছোট্ট মাঠ ডিঙিয়ে পৌঁছে যাই জলিলপুরে।
গ্রামটা যেন নিজের গ্রামেরই বিপরীত প্রতিচ্ছবি। বসন্তপুরের রাস্তা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেলেও ঘরবাড়ি থাকে দূরে সরে, খোলামেলা এক বিন্যাসে। জলিলপুরে উল্টো ছবি — বাড়িঘর দাঁড়িয়ে রাস্তার দুই কাঁধ ছুঁয়ে, মাথার ওপর গাছের ছায়া জড়াজড়ি করে বানিয়ে তুলেছে সবুজ এক সুড়ঙ্গ, যেন গ্রামটা নিজেকে আড়াল করে রেখেছে অচেনা চোখ থেকে। সেই সুড়ঙ্গ ধরে হাঁটতে হাঁটতে বারবার মনে হয়, এই বুঝি বাঁকের ওপারেই স্কুল — কিন্তু বাঁক ফুরোলে আসে আরও ছায়া, আরও নিভৃত পথ।
শেষমেশ একটা পাড়া ফুরোলে চোখে পড়ে একচিলতে মাঠ, আর তার ওপারে, গ্রাম-গা ঘেঁষে দাঁড়ানো সেই স্কুল — লজ্জাবতী লতার মতো নিজেকে গুটিয়ে রাখা একটা একলা দালান। বসন্তপুরের দুই-দালানের স্কুল দেখা চোখে এই এক-দালান বড় বেশি বিনয়ী, বড় বেশি সাধারণ মনে হয়। তখনো জানা ছিল না, বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রাইমারি স্কুলই এমন, একটামাত্র দালান নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে নিঃসংকোচে।
সেই নাস্তিক স্যারের সাথে দেখা হলো না, কথাও না। রহস্য রহস্যই রয়ে গেল সেদিন — আর এখন মনে হয়, হয়তো এটাই ভালো হয়েছিল। কিছু কৌতূহল অপূর্ণ থাকলেই বেঁচে থাকে; উত্তর পেয়ে গেলে যা সেই মুহূর্তেই মরে যায়। স্কুল পেরিয়ে মেঠো আলপথ ধরে কিছুদূর হেঁটে ফিরে আসি বাড়ির পথে, সন্ধ্যা নামার আগেই — কারণ সন্ধ্যা পেরোলে যে বিপদ, তা বালকবুদ্ধিতেও স্পষ্ট ছিল।
যেনো রহস্য একটা বন্ধ দরজা,
খুলে ফেললেই যার আলো নিভে যায় —
তাই বালক ফিরে আসে দরজার সামনে থেকেই,
রহস্যকে অক্ষত রেখে, নিজেকে অতৃপ্ত রেখে।
এই ছিল আমার প্রথম স্মৃতি — বাড়িতে না বলে দূরের কোনো গ্রাম দেখতে যাওয়ার প্রথম অভিযান। ছোট্ট এক পদযাত্রা, অথচ তার ভেতর ঘুমিয়ে ছিল আজীবনের একটা প্রবণতার প্রথম শ্বাস।
শক্তিয়ার খলা বাজার: মিছিলের ছদ্মবেশে
আমাদের বাড়িতে তখন কাজ করত আব্দুল মান্নান নামের একটা কিশোর ছেলে। বাবা তার চোখে একটা সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন, আর তাই কাজের পাশাপাশি স্কুলেও পড়ার সুযোগ করে দেন তাকে। এই দাক্ষিণ্য মান্নান আর তার পরিবারকে বাবার প্রতি এক ধরনের অন্ধ ভক্তিতে বেঁধে ফেলে, দুই বাড়ির মধ্যে শুরু হয় নিয়মিত আসা-যাওয়া। এই সম্পর্কের নিচে অবশ্য আরেকটা স্রোতও বইছিল — বাবা তখন জামাতের সাংগঠনিক বিস্তারে ব্যস্ত, মানুষ বাড়ানোর তাগিদে সম্পর্কের জাল বুনে চলতেন চারপাশে, আর মান্নানের সম্ভাবনা দেখেই তাকে নিয়ে টার্গেট শুরু করেছিলেন। সেই লক্ষ্যে বাবা সফলও হয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত — মান্নান আজ জামাত করে, বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংকে বড় পদে বসে আছে। তার বিস্তারিত গল্প তোলা থাক অন্য কোনো অধ্যায়ের জন্য।
একদিন মান্নানদের বাড়িতে গিয়ে দিগন্তজোড়া মাঠের ওপারে চোখে পড়ে একটা রক্তলাল দালান, যেন মাঠের সবুজের মাঝে কেউ একফোঁটা রক্ত ফেলে দিয়েছে। জিজ্ঞেস করে জানা যায়, ওটা পরিবার পরিকল্পনা অফিস আর গ্রাম স্বাস্থ্য কেন্দ্র, জায়গাটার নাম শক্তিয়ার খলা বাজার। সেই লাল দালান দেখার কৌতূহল বুকের ভেতর পুষে রাখি, সুযোগের অপেক্ষায় — কারণ কৌতূহল তো এমনই, একবার জন্ম নিলে সহজে মরে না, শুধু সুযোগের জন্য ঘাপটি মেরে বসে থাকে।
সুযোগ আসে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়ায়। কোনো এক প্রার্থীর সমর্থনে একটা মিছিল যাচ্ছিল গ্রামের রাস্তা ধরে, আর মিছিলের সেই হৈ-হুল্লোড়, সেই উৎসবের ঘোর আমাকে টেনে নেয় ভিড়ের ভেতর। শুনি, মিছিল যাবে শক্তিয়ার খলা পর্যন্ত, তারপর ফিরে আসবে। মাথায় চট করে বুদ্ধি খেলে যায় — এই তো সুযোগ, ভিড়ের আড়ালে লুকিয়ে সেই লাল দালান ছুঁয়ে আসা। মিছিলের সাথে থাকলে হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই, ভয় নেই ছেলেধরার গল্পেরও — একটা সংগঠিত ভিড় নিজেই যেন একটা রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে একলা এক বালকের জন্য।
মিছিল এগোয় বসন্তপুর বাজার পেরিয়ে উলাসনগরের ওপর দিয়ে — সে গ্রামে থাকতেন মোড়ল, আর মোড়লবাড়ি দেখার সাধ ছিল বহুদিনের, সেটাও মিছিলের ফাঁকে একঝলক দেখা হয়ে যায়। তারপর মিছাখালি নামের এক নদী, যে নদী বর্ষায় ফুলে ওঠে, শীতে শুকিয়ে হয়ে যায় চরের মতো নিরুপায়। নদী পেরিয়ে পেটনা, তারপরেই কাঙ্ক্ষিত শক্তিয়ার খলা। শীতকাল তখন, আর মিছাখালির এপার থেকেই প্রথম দেখা মেলে সেই লাল দালানের — দূর থেকে যতটা রক্তলাল মনে হয়েছিল, কাছে গিয়ে ততটাই বিশাল, ততটাই দুর্গম।
শিশুর চোখে কী বিস্ময়! একটা বাড়ি এত লাল হতে পারে, আর এত বড়ও! কিন্তু দুঃখের কথা, দালানের চত্বরে পা পড়ে না — একে তো মিছিলের সাথে বাঁধা পড়া শরীর, তার ওপর চত্বরটা ঘেরা কাঁটাতারের বেড়ায়, জীবনের প্রথম কাঁটাতার দেখা সেদিনই। আমাদের গ্রামের বাড়িঘরে বেড়া বলতে কিছু ছিল না, থাকত শুধু সুপারি পাতার বা ঝোপঝাড়ের নরম আড়াল, প্রবেশের জন্য একটা দেউড়ি। অথচ এই দালানের সীমানায় লোহার এক বিশাল গেট, আর তার পাশ ঘিরে ধারালো তারের বুনন — যেন প্রথমবার বোঝা যায়, রাষ্ট্র নামের জিনিসটা মাটির দেউড়ির চেয়ে অনেক বেশি কঠিন, অনেক বেশি দূরত্বপ্রিয়।
যেনো একটা বেড়া, একলা দাঁড়িয়ে বলে —
এইখানে থামো, এর বেশি নয় —
অথচ বালকের চোখে বেড়াটাই আরেকটা রহস্য,
আরেকটা না–দেখা দেশের সীমান্তরেখা।
মিছিলের সাথেই ফিরি বসন্তপুর বাজারে, যেখানে শেষে বিতরণ হয় মুড়ি আর গুড়, ছোট্ট পলিথিনের মোড়কে। সেই মুড়ি-গুড় চিবোতে চিবোতে স্কুলে পা রাখতেই কানে আসে, স্কুলে নাকি পরীক্ষা চলছে! দৌড়ে যাই স্যারের কাছে। লতিফ স্যার হাতে একটা প্রশ্ন ধরিয়ে দিয়ে নাম লিখতে বলেন, আরও কী কী যেন লিখতে বলেন, সাথে দুই আর দুইয়ের যোগফল কষতে বলেন। কাজ সেরে ফেলার পর কাগজটা হাতে ধরিয়ে বলেন, “মাকে দিয়ে বলবে, তুমি পাস।” সেই আনন্দের কোনো ভাষা হয় না — লাফাতে লাফাতে, দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি ফিরে মাকে কাগজ দেখিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকি, আমি পাস, আমি পাস।
কিন্তু আনন্দের আয়ু বড় কম। কিছুদিন পর স্কুল শুরু হলে ক্লাসে গিয়ে হতাশ হই — রোল ডাকার সময় নাম প্রথমে ওঠে না আমার। প্রথমে ডাকা হয় শহিদ মিয়া নামের একটা ছেলেকে, তারপর আমাকে — রোল দুই। সেই মুহূর্তেই মনের গভীরে গেঁথে যায় একটা জেদ, নীরব অথচ অনড় — এক হতেই হবে। পরের বছর থেকে সেই প্রাইমারি স্কুলে আর কখনো দ্বিতীয় হইনি। লাল দালানের কাঁটাতার যেমন শিখিয়েছিল, সীমানা মানেই সমাপ্তি নয়, বরং আরেকটা প্রশ্নের শুরু — তেমনি রোল দুই হওয়ার সেই ছোট্ট আঘাতও শিখিয়ে দেয়, প্রথম হওয়া মানেই শেষ কথা নয়, বরং একটা নতুন তাড়নার প্রথম বীজ।
বিশ্বম্ভরপুর: টাওয়ারের প্রথম দর্শন
আমাদের থানা শহর বিশ্বম্ভরপুরের কথা কানে আসত লোকমুখে, প্রায় রূপকথার মতো — সেখানে নাকি পাকা রাস্তা আছে, একটা হাই স্কুল আছে, আছে অসংখ্য সরকারি অফিস, আর আছে অফিসার্স কোয়ার্টার নামের এক রহস্যময় শব্দবন্ধ, যার অর্থ তখনও অধরা, কিন্তু ঠিক সেই অজানাটুকুই কৌতূহলকে দ্বিগুণ করে তুলত। প্রশ্ন ছিল একটাই — সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরের সেই শহর কীভাবে দেখা যায়।
বলে রাখা ভালো, আমার জন্ম এমন এক পাড়াগাঁয়ে, যে গাঁ থেকে আজ, এই ২০২৬ সালেও, জেলা শহরের সাথে কোনো পাকা যোগাযোগ নেই। গ্রামের ভেতরের রাস্তাটুকুও আজও কাঁচা, মাটির। দূরের শহরে পৌঁছাতে ভরসা ছিল মেঠো পথ, বাহন বলতে পা আর সাইকেল, বর্ষায় শুধু নৌকা। সময় যেন এই গ্রামের সীমানায় এসে একটু ধীর হয়ে গেছে, আজও।
সুযোগ আসে স্কুলের এক ঘোষণায় — থানা শিক্ষা অফিস থেকে পাঠ্যবই আনার জন্য ছাত্র বাছাই হচ্ছে। রীতি ছিল, ক্লাস ফাইভের বড় ছাত্ররা মাথায় বই বয়ে আনবে, পরে বিতরণ হবে ছোটদের মধ্যে। ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি তখন, আমি সবে ক্লাস থ্রিতে। বয়সে ছোট বলে স্যার প্রথমে দলে নিতে নারাজ — এ কাজ শুধু ফাইভের ছাত্রদের জন্য। কিন্তু বায়নার কাছে স্যারও শেষমেশ নরম হন খানিকটা, বলেন বাড়ির অনুমতি আনতে।
অনুমতি মিলবে না, তা ভালোই জানা — ততদিনে বাড়ির কড়াকড়ির বেড়াজাল বালকমনেও গেঁথে গিয়েছিল গভীরভাবে। তাই যেদিন ছাত্ররা রওনা হবে, নিঃশব্দে তাদের সঙ্গ নিই। ছাত্ররা প্রথমে গা করে না, বলে স্যারের অনুমতি লাগবে। জবাবে একটা ছোট্ট মিথ্যা বুনে দিই — স্যার আর বাড়ি, দুইয়েরই অনুমতি আছে। ভাগ্য ভালো, স্যার আগেই অফিসিয়াল কাজে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, ছাত্ররা যাচ্ছিল পরে, একা। মোবাইল ফোনহীন সেই যুগে তাৎক্ষণিক যাচাইয়ের কোনো উপায়ও ছিল না — মিথ্যাটা তাই নিরাপদে বেঁচে যায়।
পথের একাংশে হাঁটুজলের কাদা, হয়তো সাম্প্রতিক বৃষ্টির জের। সেই কাদা ডিঙিয়ে ছাত্রদের সাথে সাথে হাঁটি, চোখে নতুন মাঠ, নতুন গ্রাম, প্রতিটা বাঁকে নতুন আবিষ্কারের শিহরন। এই পথেই প্রথম দেখা মেলে মহিষে টানা এক ঠেলাগাড়ির, বাঁশের বোঝা নিয়ে চলেছে বিশ্বম্ভরপুর বাজারের দিকে, মন্থর, ভারী পায়ে, যেন শতাব্দীর পুরনো একটা ছন্দ বহন করে চলেছে কাদাপথ ধরে।
দুইটা মাঠ পেরোতেই দিগন্তরেখায় জেগে ওঠে আরেক বিস্ময় — দূর আকাশে দাঁড়িয়ে একটা বিশাল টাওয়ার। জিজ্ঞেস করি সঙ্গীদের, জানা যায় ওটা টি অ্যান্ড টি অফিসের টাওয়ার, যা দিয়ে টেলিফোন চলে। সেই একই মেঠো পথে, একই বিকেলে, একদিকে মহিষে টানা গাড়ির আদিম ছন্দ, অন্যদিকে আকাশ ছোঁয়া টেলিফোন টাওয়ারের ভবিষ্যৎ-ইশারা — দুই যুগ যেন হাত ধরাধরি করে হাঁটছিল একই কাদাপথে, বালকচোখেও যা একটা অদ্ভুত, নাম-না-জানা দ্বন্দ্ব হয়ে ধরা দেয়। সেই টাওয়ারই পরবর্তী জীবনে হয়ে ওঠে বিশ্বম্ভরপুরের ব্যক্তিগত ল্যান্ডমার্ক — যতবার সেই শহরমুখী হয়েছি, দূরের কোনো গ্রাম থেকে ওই টাওয়ার চোখে পড়লেই মনে হয়েছে, ঐ তো বিশ্বম্ভরপুর, ঐ তো ভবিষ্যতের ইশারা।
যেনো একটা টাওয়ার আকাশ ফুঁড়ে বলে —
এসো, শব্দকে বন্দী করা যায় তারে,
অথচ পাশ দিয়ে মহিষের গাড়ি চলে যায় নিঃশব্দে,
যেন সময়ের দুই প্রান্ত একই পথে হাঁটে, কথা না বলেই।
সেদিন ছাত্রদের সাথে সারাদিন ঠিক কী করেছিলাম, আজ আর স্পষ্ট মনে নেই। স্মৃতিতে টিকে আছে শুধু বিস্ময়ভরা চোখ — পাকা রাস্তা, তার পাশে সার বেঁধে দাঁড়ানো সরকারি কোয়ার্টারের পাকা দালান। শুনি, সরকারি চাকরি পেলেই ওসব দালানে থাকা যায়, আর সরকারি চাকরি পেতে হলে চাই লেখাপড়া — একটা সহজ সমীকরণ, যা বালকমনে গেঁথে যায় সেদিনই, যদিও তার পূর্ণ মানে বুঝতে লেগে যাবে আরও অনেক বছর। হাই স্কুলের ভেতরে যাওয়া হয়নি, ওটা ছিল মূল রাস্তা থেকে দূরে, তবে দূর থেকেই দেখা হয় তার বিশাল দালান আর বিস্তৃত মাঠ।
সুনামগঞ্জ শহর: সুরমা পেরিয়ে
সুনামগঞ্জ শহরের কথাও কানে আসত লোকমুখে, আরও বড় এক রূপকথা হয়ে — ওটা জেলা শহর, বিশ্বম্ভরপুরের চেয়েও ঢের বড়, অজস্র পাকা রাস্তা, চারদিকে দালানের সারি, গলি-ঘুপচি, অসংখ্য গাড়ি-যানবাহনের কোলাহল। বাবা মাঝেমধ্যে সেই শহরে যেতেন জামাতের কাজে, অফিসের কাজে। বায়না ধরতাম সাথে যাওয়ার, কিন্তু সারাদিন এত ছোট একটা ছেলেকে কোথায় রাখা হবে, এই দুশ্চিন্তাতেই হয়তো বাবা রাজি হতেন না। তবু সুযোগ খুঁজে বেড়াতাম মনে মনে, নিঃশব্দে, ধৈর্য ধরে — কৌতূহল তো অপেক্ষা করতে জানে, শুধু ভুলে যেতে জানে না।
সুযোগ আসে এক দুঃখজনক ঘটনার হাত ধরে। গ্রামে ঘটে যায় একটা হত্যাকাণ্ড, আর তার জেরে বারোজন মানুষকে আসামি করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের কারাগারে। তাদের বউ, মা, আত্মীয়স্বজন ঠিক করেন, কেসের তারিখে শহরে গিয়ে দেখা করে আসবেন। বায়না ধরি আমিও তাদের সাথে যাওয়ার। দলে ছিলেন শাহেদার মা, যার সাথে আমাদের বাড়ির সম্পর্ক গভীর, আর মা-বাবার চোখে যিনি ছিলেন দায়িত্বশীল, ভরসাযোগ্য। বুঝেছিলাম, তার হাত ধরে গেলে বাড়িতে জানলেও অতটা বকাবকি জুটবে না।
ঘরে জানাই, বায়নাও ধরি, তবু তেমন পাত্তা পাই না। যেদিন তারা রওনা হবেন, ভোরের প্রথম আলোতেই গিয়ে হাজির হই শাহেদার মায়ের দুয়ারে — আমিও যাব। তিনি প্রথমে গররাজি, তখন একটা কৌশলী মিথ্যায় নিজেকে সাজাই — ঘরে বলেই এসেছি, বাবার কাছ থেকেই ফিরব শহর থেকে, যেহেতু বাবাও যাচ্ছেন কেসের কাজেই, তিনিই তো সেই বারোজন আসামির অভিভাবকের মতো, তিনিই উকিল ঠিক করেছেন, কোর্ট-কাচারির খোঁজ রাখছেন।
সাড়ে তিন ঘণ্টার সেই হাঁটাপথ শুরু হয় মেঠো সুর ধরে, বিশ্বম্ভরপুরের পাশের গ্রামগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে — গণ্ডামারা, চান্দেরগাঁও, বোয়ালিয়া, কারেন্টের বাজার, পলাশ। পথের কোথাও কোথাও ব্রিটিশ আমলের এক ভাঙা পাকা রাস্তার কঙ্কাল চোখে পড়ে — পিচ উঠে গিয়ে খোয়া-পাথর ছড়িয়ে আছে, আর কিছুদূর পরপর পড়ে আছে পরিত্যক্ত পিচের ড্রাম, সমান করার কাজে লাগা ভারী রোলারের কিছু চিহ্ন। যন্ত্রপাতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তির কারিগরি — আরেকবার বালকচোখে বিস্ময়ের ঝলক, যদিও এবার সেই বিস্ময় দাঁড়িয়ে ছিল একটা ভাঙনের গায়ে, একটা সাম্রাজ্যের ফেলে যাওয়া কঙ্কালের ওপর।
আড়াই ঘণ্টা হাঁটার পর দল বিশ্রাম নেয় এক মাঠে। দলে শুধু মহিলারা, জনা দশ-বারো। যার যার কাপড়ের কোঁচড় থেকে, গাঁটরি থেকে বেরিয়ে আসে খাবার — কারও রান্না করা ভাত-তরকারি, কারও শুকনো রুটি। সবাই মিলে ভাগ করে খায়, তারপর আবার পথ। খাবার সাথে নেওয়ার এই সহজ প্রজ্ঞাটা সেদিনই প্রথম মাথায় ঢোকে, অথচ নিজে কোনো খাবার না নিয়েই সেই যাত্রা করেছিলাম বলে হয়তো আজও কোথাও বেরোনোর আগে পথের খাবার নিয়ে বিশেষ ভাবি না — কিছু অভ্যাস জন্ম নেয় অনুপস্থিতি থেকেই।
বিশ্বম্ভরপুর ছাড়িয়ে পরের গ্রাম থেকেই সুনামগঞ্জের আকাশে জেগে ওঠে আরেকটা টাওয়ার, আগেরটার চেয়ে ঢের বড়, ঢের অহংকারী। বিশ্বম্ভরপুরেরটা ছিল নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত সমান্তরাল, নিরহংকার এক রেখা; এটা নিচে চওড়া, ওপরে ক্রমশ সরু, মাথায় বসানো ড্রামের মতো বিশাল অ্যান্টেনা, যেন আকাশের সাথেই কথা বলছে। বালকচোখে আবারও বিস্ময়ের ঝলক, তবে এবার তার সাথে মিশে যায় একটা চাপা ভয়ও — এত বড় শহর, তার আগেই এত বড় ইশারা।
সুরমা নদীর পাড়ে পৌঁছাতেই নদীর ওপারে দেখা যায় সুনামগঞ্জ শহর — নদীতীর ঘেঁষে ছুটে চলা শত শত রিকশা, এপার থেকেই শোনা যায় মানুষের কোলাহল, যানবাহনের গুঞ্জন। হাতে বাওয়া নৌকায় নদী পার হই, আর সেই পারাপারেই প্রথমবার ভয়ের সাথে সত্যিকার মুখোমুখি হই — নৌকা যাত্রীতে ঠাসা, পানি কানায় কানায়, মনে মনে প্রশ্ন জাগে, যদি ডুবে যায়! সেই আশঙ্কা বুকের ভেতর দানা বাঁধে, তবু নৌকা নিরাপদে তীরে ভেড়ে, যেন ভয় নিজেই একটা পরীক্ষা ছিল, যা পার হতে হয় নীরবে।
যেনো একটা নদী, যার বুকে ভাসে ভয়,
আর সেই ভয়ের ওপর দিয়েই পার হতে হয় বড় হওয়া —
কানায় কানায় পানি, তবু ডোবে না নৌকা,
শুধু কাঁপে বুক, নিঃশব্দে, কাউকে না জানিয়ে।
শহরে পা রাখতেই কানে বাজে অজস্র কাকের ডাক — শহরে এত কাক থাকে! চারদিকে ছড়ানো ময়লা, নাকে লাগা এক অস্পষ্ট দুর্গন্ধ, যা আজ আর হুবহু মনে নেই। নদী পেরিয়ে শহরের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই জেলখানার সামনে, তার দেয়াল ঘেঁষে সার বেঁধে দাঁড়ানো অসংখ্য দোকান, বেশিরভাগ খোলা দোকান, তার মধ্যেও সবচেয়ে বেশি পান-সুপারির পসরা।
পথের মাঝামাঝি কোথাও, খাবার বিরতির কিছুক্ষণ পরে, বাবার সাথে দেখা হয়ে যায় রাস্তায় — তিনি আসছিলেন সাইকেলে চড়ে। বাড়িতে জানা হয়ে গিয়েছিল যাত্রার খবর, তাই ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিলেন বড় ভাইয়ের একটা প্যান্ট — নিজের কোনো লম্বা প্যান্ট ছিল কিনা, আজ আর স্পষ্ট মনে নেই। তবে স্পষ্ট মনে আছে, বাবা তিরস্কার করতে করতেই সেই প্যান্ট পরিয়ে দিয়েছিলেন, নিচ থেকে ভাঁজ করে করে তুলে দিয়েছিলেন যেন পা বেরিয়ে থাকে — বকুনি আর যত্ন যেন একই হাতের দুই আঙুল, আলাদা করা যায় না। বাকি পথ কাটে বাবার সাইকেলের সামনের রডে বসে, সারাদিন বাবার সাথেই থাকি, মাঝে একবার আবার রেখে যাওয়া হয় সেই মহিলাদের দলের কাছে।
সুনামগঞ্জ শহরে প্রথমবার দেখা মেলে চার চাকার আধুনিক গাড়ির, বিশেষত অনেকগুলো জিপ। চারপাশে মানুষের ঢল, কোলাহল, দোকানপাট, রিকশা, সাইকেল, ছেলেমেয়েদের দৌড়াদৌড়ি। সেবারই প্রথম দেখি একটা মেয়ে ছোট্ট একটা সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে, অবলীলায়, যেন শহরটাই তার নিজের উঠোন — বালকচোখে নেমে আসে বিস্ময়ের এক গোটা রাজ্য। এই বুঝি শহর, শহর তাহলে এমনই হয়!
জলিলপুরের সেই প্রথম, নিরীহ পদযাত্রা থেকে সুনামগঞ্জ শহরের এই দীর্ঘ, ঘটনাবহুল অভিযান পর্যন্ত — প্রতিটা যাত্রাতেই কৌশল হয়ে উঠেছে একধাপ জটিল, একধাপ সাহসী। প্রথমবার শুধু একা হেঁটে যাওয়া, দ্বিতীয়বার মিছিলের ভিড়ে নিজেকে মিশিয়ে ফেলা, তৃতীয়বার মিথ্যা অনুমতির ছদ্মবেশ পরা, চতুর্থবার এক বিশ্বস্ত মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে সামাজিক বৈধতা বানিয়ে নেওয়া। প্রতিটা অভিযানের কেন্দ্রে ছিল একই তাড়না — না-দেখা কিছু দেখার তীব্র কৌতূহল, আর সেই কৌতূহলের পথে যা-ই বাধা আসুক, তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার একটা সহজাত দক্ষতা। এই দক্ষতাই হয়তো ঢের আগে থেকেই গড়ে দিয়েছিল পরবর্তী জীবনের আরও অনেক পালানোর, আরও অনেক দুঃসাহসের ভিত।
যেনো একটা বালক, বারবার হেঁটে যায় সীমানার দিকে,
প্রতিবার একটু বেশি সাহস নিয়ে, একটু কম ভয় নিয়ে —
আর প্রতিটা সীমানা পেরোনোর পরে বুঝতে পারে,
সীমানা তো আসলে ছিলই না, শুধু মনের বানানো একটা রেখা।

মন্তব্য করুন